প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের দিন কি শেষ?

27
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের দিন কি শেষ?
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন হস্তক্ষেপ ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নির্মম বাস্তবতা। সরকারপ্রধান কে হবেন, কোন দল ক্ষমতায় আসবে বা বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের যে অভিঘাতগুলো, সেই অভিঘাতগুলো নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল খোলামেলা এবং বাংলাদেশে যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব পালন করতেন তাকে প্রায় প্রধানমন্ত্রীর সমকক্ষ মর্যাদা দেওয়া হতো। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথায় কথায় হিতোপদেশ দিতেন। কিন্তু ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে বাংলাদেশ আস্তে আস্তে স্বাবলম্বী হতে থাকে। স্বাবলম্বী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ কমতে থাকে। গত দেড় বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন হলো মার্কিন প্রভাব বলয়ের সংকোচন। এই সময়ে মার্কিন হস্তক্ষেপ কমতে শুরু করেছে এবং আস্তে আস্তে বাংলাদেশের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপও কমছে।

আমরা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখবো যে, প্রতিটি সরকার পরিবর্তন বা ঘটনার বাঁকে বাঁকে মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের ভূমিকা এবং প্রভাব ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হয়ে বাংলাদেশে আসেন ডেভিস বোস্টার। একাধিক দলিল আর গ্রন্থে পাওয়া যায় যে, তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে জানতেন এবং খুনীরা একাধিকবার তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিল। তিনি মোশতাকের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন। বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায় যে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর এরশাদের পতন ঘটে নব্বইয়ের ৬ ডিসেম্বর। নব্বইয়ের ২৭ জুন উইলিয়াম বি মাইলাম বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন এবং তিনি আসার পরেই কলকাঠি নাড়তে শুরু করেন। এরশাদের পতনের আগে মাইলাম আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন। এই কথা সকলেই জানেন যে, নব্বইয়ে এরশাদের পতনের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় ভূমিকা ছিল।

আরও পড়ুন:  মনোয়ারা বেগম মনির স্বপদ এখনও বহাল আছে

ম্যারি আন পিটার্স ২০০০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০১ এর নির্বাচনে বিএনপিকে জেতানোর ক্ষেত্রে ম্যারি আন পিটার্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা সকলেই জানে। বিশেষ করে ঐ নির্বাচনে যেন তথাকথিত নিরপেক্ষতার নামে আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করার যে ফর্মুলা সেই ফর্মুলা এসেছিল মার্কিন দূতাবাস থেকেই।

২০০৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্যাট্রিসিয়া বিউটিনেস। প্যাট্রিসিয়া বিউটিনেস দায়িত্ব গ্রহণের পর কূটনৈতিক চক্র গড়ে ওঠে এবং যাঁদের মাধ্যমে ওয়ান ইলেভেন এসেছিল। সেসময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটিনেস, ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী এবং ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন জোট বেঁধে ওয়ান ইলেভেন ফর্মুলা আবিষ্কার করেন বলেও কোন কোন কূটনৈতিক মনে করেন।

প্যাট্রিসিয়া বিউটিনেস ২০০৭ সালের ২৩ জুন চলে যাওয়ার পরেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের যাত্রাপথ প্রশস্থ হয় এবং নতুন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ ম্যারিয়টি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি আসার পর বাংলাদেশে নির্বাচন হয় এবং একটি অবাধ সুষ্ঠ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসে। এই নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করার ক্ষেত্রেও জেমস ম্যারিয়টির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একাধিক উপদেষ্টার সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছিলেন। সেসময় একটি পত্রিকায় লেখা হয়েছিল যে, জেমস এফ ম্যারিয়টি হলেন বাংলাদেশের আসলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান।

আরও পড়ুন:  স্বাস্থ্য-মাফিয়াদের বিপক্ষে একা ল’ড়ছেন প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন সচিব মান্নান

এরপর মার্সিয়া বার্নিকাট বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং মার্সিয়া বার্নিকাট ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করা এবং নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্ন উত্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে তিনি তাতে সফল হননি। মার্সিয়া বার্নিকাটের সময়ে আরেকটি ঘটনা ঘটে, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে হাইকোর্টের নির্দেশে অপসারণ করা হয় ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান এবং শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে এবং তাকে অপসারণের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, বিশেষ করে হিলারি ক্লিনটন শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করে তাঁর উষ্মার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা এটাকেই মার্কিন হস্তক্ষেপের শেষ নজির মনে করেন এবং এরপর থেকে আস্তে আস্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ কমাতে শুরু করে এবং এখান থেকেই মার্কিন কর্তৃত্বের অবসান হওয়া শুরু হয়। এর প্রধান কারণ হলেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা যখন মার্কিন কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন তখন মার্কিন হস্তক্ষেপ আস্তে আস্তে প্রশমিত হতে থাকে। এখন বাংলাদেশের মার্কিন রাষ্ট্রদূত হলেন রবার্ট মিলার। রবার্ট মিলার দায়িত্ব গ্রহণের পর একটি নির্বাচন হয়েছে, যে নির্বাচন নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে খুব একটা কথা বলেননি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপও আগের মতো নেই।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 11
    Shares