প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত

বিপ্লবী কমরেড হো চি মিনের মৃত্যুবার্ষিকীতে লাল সালাম

13
বিপ্লবী কমরেড হো চি মিনের মৃত্যুবার্ষিকীতে লাল সালাম
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়াভিয়েতনামের স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা ব্যক্তিত্ব হো চি মিন। বিশ্ব ইতিহাসে যে কয়জন ব্যক্তি একটি জাতির জন্য স্বাধীনতার দূত হয়ে এসেছিলেন হো চি মিন তাদের মধ্যে অন্যতম। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে একটি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে উঠতে পারেন তারই বড় প্রমাণ হো চি মিন। এই আধুনিক বিশ্বেও তার কীর্তি সবার জন্য অনুপ্রেরণীয়।

হো চি মিন ছিলেন ভিয়েতনামের একজন কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা, যিনি পরবর্তীকালে গণপ্রজাতন্ত্রী ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী (১৯৪৬–১৯৫৫) এবং রাষ্ট্রপতির (১৯৪৫–১৯৬৯) পদে আসীন ছিলেন। তিনি ডেমোক্রাটিক রিপাবলিক অব ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠাতা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তিনি আমৃত্যু ভিয়েত কং-এর নেতৃত্ব দান করেন।

হো চি মিন ভিয়েত মিন স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা ছিলেন। ১৯৪১ সালের পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বেই স্বাধীনতা সংগ্রাম বজায় থাকে, এবং ১৯৪৫ সালে কমিউনিস্ট শাসিত ডেমোক্রাটিক রিপাবলিক অফ ভিয়েতনাম সরকার প্রতিষ্ঠা হয়। যারা ১৯৫৪ সালে ফ্রেঞ্চ ইউনিয়নকে দিয়েন বিয়েন ফু যুদ্ধে পরাস্ত করে। এই যুদ্ধের প্রধান ছিলেন ভিয়েতনাম গণফৌজ এর প্রতিষ্ঠাতা ভো নগুয়েন গিয়াপ। উত্তর ভিয়েতনামের রাজনীতিতে তার প্রভাব ১৯৫০-এর দশকের শেষভাগে সীমিত হয়ে আসে। কিন্তু মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির পদে আসীন ছিলেন। দক্ষিণ ভিয়েতনামের পতনের পর সেখানকার পূর্বতন রাজধানী সাইগনের নাম পাল্টে হো চি মিন শহর রাখা হয় তার সম্মানার্থে।

ভিয়েতনামে ক্ষমতায় আসার আগে হো চি মিনের জীবন অস্পষ্ট ছিল। তিনি ৫৮২ থেকে ২০০ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন বলে জানা যায়। তাঁর জন্ম একাডেমিক বিতর্কের বিষয়। নাম, তারিখ, স্থান এবং অন্যান্য কঠোর তথ্যগুলিতে কমপক্ষে বিদ্যমান চারটি সরকারী জীবনীতে পার্থক্য দেখা যায় এবং অনানুষ্ঠানিক জীবনীগুলি আরও ব্যাপকভাবে পার্থক্যসমূহকে দেখায়।

হো চি মিন ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠাতা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমৃত্যু ভিয়েত কং-এর নেতৃত্ব দান করেন তিনি। হো চি মিন ভিয়েতনামের স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা ছিলেন। স্বপ্ন দেখেছেন নতুন ভিয়েতনামের এক স্বাধীন রাষ্ট্রের। স্বপ্ন দেখেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই করেছেন ফরাসি ও আমেরিকানদের বিরুদ্ধে। ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতা সাধারণ জনগণের জন্য। পড়াশোনা শেষ করেই জড়িয়ে পড়েন ফরাসি বিপ্লবে। তার সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন তার বাবা নগুয়েন সাক। পরিণতি হিসেবে শাসকগোষ্ঠী অন্যান্য আন্দোলনকারীর সঙ্গে তাকেও গ্রেফতার করে। পরে ফরাসি শাসকগোষ্ঠী সিন সাককে আটকে রাখে পৌলো বন্দর কারাদ্ব্বীপে। বাবা গ্রেফতার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল হো চি মিনের ছাত্রজীবন এবং শুরু হলো প্রত্যক্ষ সংগ্রামী জীবন।

আরও পড়ুন:  আওয়ামী লীগের স্বীকৃত ও বিকৃত জিয়া

বিপ্লবী এই নেতা ভিয়েতনামকে স্বাধীন রাষ্ট্র এবং দেশের সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য আজীবন আন্দোলন করে গেছেন। ১৯২০ সালের ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় দিনের প্যারিস সফরে যান। সেখানে ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টির ১৮৩তম অধিবেশনে যোগ দেন ভিয়েতনামের প্রতিনিধি হিসেবে। বিশ্ব প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরেন ভিয়েতনামের ওপর ফরাসিদের নিপীড়নের কথা। দেশের মানুষের ঐক্য আর সংগঠনের মাধ্যমে বিপ্লব গড়ে তুলতে গঠন করেন ভিয়েতনামি বিপ্লবী তরুণ সংঘ। অনেক সংগ্রামের পর ভিয়েতনামে শেষ হয় ফরাসি শাসন। ভিয়েতনামের আলোর দিশারি হো চি মিন তার ভাষণে বলেন, ‘প্রিয় বন্ধুগণ, বিপ্লবের জন্য আপনাদের সাহায্য করার প্রয়োজনে আজ এখানে আসতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে স্বীকার করছি যে, আমার জন্মভূমিতে যে ঘৃণ্য ও অবিচার সংঘটিত হয়েছে ও হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর উদ্দেশ্য নিয়েই সমাজতন্ত্রী হিসেবে আমি এখানে উপস্থিত হয়েছি। আপনারা অবগত আছেন, পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় হতে চলল ফরাসি ধনবান শোষকগোষ্ঠী ইন্দোচীনে তার হিংস্র রূপ নিয়ে এ অঞ্চলে উপস্থিত রয়েছে। ধনতন্ত্রের প্রয়োজনে বেয়নেটের শক্তিতে তারা আমাদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেছে। শুরু থেকে আজ অবধি আমাদের ওপর শুধু যে নির্যাতন ও শোষণ চলছে তাই নয়, চলছে অবাধ হত্যাকাণ্ড ও বিষ প্রয়োগও। ধনবাদী লুটেরারা ইন্দোচীনের ওপর কী পরিমাণ কুিসত নিপীড়ন চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে তার বিশদ বর্ণনা সামান্য কয়েক মিনিটের মধ্যে আপনাদের সামনে উপস্থিত করা সম্ভব নয়।’ এ ছাড়া ১৯২৪ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি হো চি মিন কমিন্টার্নের নির্দেশে চীনের ক্যান্টনে বলেন, ‘একজন মানুষ যা চাইবে ইন্দোচীনে তার সবই আছে। যেমন বন্দর, খনি, বিস্তীর্ণ শস্যখেত, বিরাট বনভূমি এবং যোগ্য ও কঠোর পরিশ্রমী শ্রেণি। কিন্তু আমাদের সংগঠন ও সংগঠকের বড্ড অভাব। সে কারণেই আমাদের শিল্প আর ব্যবসা বাণিজ্যের কোনো মূল্য নেই। যদি তোমার যুবসমাজ জীবনের মধ্যে ফিরে না আসে, তবে তোমার মৃত্যু অনিবার্য।’

আরও পড়ুন:  বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতালিপ্সু মইন, ঘটি আমিনুল করিম ও বিহারি আমিনদের ভূমিকা

মহান এ নেতা ১৯৬৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। হো চি মিন হয়তো তার জীবনকালে নিজ দেশের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। এখন নিশ্চয়ই মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়ে হাস্যোজ্জ্বল সেই মহান নেতা যখন দেখেন তার দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে তখন তিনি নিশ্চয়ই আনন্দিত হন। কমরেড হো চি মিন আজও দুনিয়ার শোষিত-নিপীড়িত মানুষের কাছে অসামান্য প্রেরণা।

সকল দেশের সকল জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে মওলানা ভাসানীর ছিল সর্বাত্মক সমর্থন। ষাট এর দশকে যখন চীনের নেতাদের সাথে ভাসানীর ব্যক্তিগত যোগাযোগ স্থাপিত হয় তখন তাদের মাধ্যমে ভিয়েতনামের সমাজতান্ত্রিক নেতাদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ স্থাপিত হয়। হো চি মিনকে তিনি অকুন্ঠ সমর্থন জানিয়ে পত্র দেন। হো চি মিনের প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধা। প্রেসিডেন্ট হোর মৃত্যুতে তিনি যথার্থ অর্থেই মর্মাহত হন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ সেপ্টেম্বর পাবনার ঈশ্বরদি থেকে দেয়া এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, “হো চি মিনের মৃত্যু বিশেষভাবে উত্তর ভিয়েতনামীদের জন্য এবং সাধারণভাবে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার জনসাধারণের জন্য বিরাট ক্ষতি। হো ছিলেন ভিয়েতনামের এক কথায় গোটা বিশ্বের সংগ্রামী মানুষের নেতা।”

হো চি মিন এর ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা।

[ মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ ও আহ্বায়ক, জাতীয় কৃষক-শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন]

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 4
    Shares