প্রচ্ছদ এক্সক্লুসিভ

সিএমএইচ-এ ৪৫ দিন: জীবন-মৃত্যুর গোপন খেলা

44
সিএমএইচ-এ ৪৫ দিন: জীবন-মৃত্যুর গোপন খেলা
পড়া যাবে: 9 মিনিটে

অধ্যাপক শিখা গাঙ্গুলী চন্দনা

আজ থেকে এক’শ বছর আগে ব্রিটিশ আমেরিকান কিংবদন্তি কবি টি এস ইলিয়ট তাঁর ‘The Waste Land’ কবিতার বইয়ে লিখে গেছেন ‘April is the cruelest month…’ ঈশ্বর যদি এই কবিকে আরো শত বছর বাঁচিয়ে রাখতেন তবে তিনি হয়তো আমার জীবনের আত্যয়িক অবস্থা আর আমার ছেলে মেয়ে দুটির চোখের জলের বন্যা দেখে তাঁর কবিতার বইয়ের নাম বদলে রাখতেন ‘May is the cruelest month…’ সত্যিই সেটা ছিল মে মাসের ৬ তারিখ। আমার স্বামী বরেন চক্রবর্তী রাত এগারোটার দিকে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেই বললো তার একটু একটু জ্বর আসছে। তখনো বুঝিনি যে মূর্তিমান আতঙ্ক আমার দুয়ারে দাঁড়িয়ে হাসছে তার দন্তপাঁতি মেলে। আমার স্বামী রোগী দেখা শেষ করে রাত বারোটার আগে বাসায় ফিরেছে তা কদাচিৎ দেখা যায় না। কিন্তু সে দিন সে বেশ আগেই ফিরলো। চারপাশে করোনা নামের ভীতি, এই এক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জীবাণুর সামনে একদা মহা পরাক্রমশীল পৃথিবী যেন হাঁটু গেঁড়ে বসে গেছে প্রার্থনার ভঙ্গীতে। আইইডিসিআর এর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা আমার বান্ধবী। আমরা এক সাথে একই কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেছি। ফ্লোরাকে ফোন করলাম।

জ্বরের কথা শুনেই ফ্লোরা বললো- দাদার জ্বর এখনই লোক পাঠাচ্ছি তোর বাসায় কোভিড টেষ্টের জন্য। সকালে ফ্লোরার মেসেজ আমাদের দুজনেরই কোভিড নিগেটিভ। কিন্তু নিয়তি হয়তো তখন হাসছিল অলক্ষ্যে। জ্বর গেল না। আইইডিসিআর থেকে আবার দ্বিতীয়বার কোভিড টেস্ট করালাম। দশ তারিখ রাত দশটার দিকে, ডা. শরীফের ফোন, ত্রস্ত সশঙ্ক হয়ে ফোনটা ধরলাম, মনে ভাবলাম ওই বুঝি অশনি সংকেত। কাঁপা কাঁপা গলায় শরীফ আমাকে জানিয়ে দিল দুর্বার্তার খবরটি। বুঝে গেলাম করোনা নামের এক অপগ্রহের নিগড়ে আমরা ফেঁসে গেছি ভীষণভাবে। একটু পরেই ফোন করলো ডা. হিমেল, কোথায় ভর্তি হব তা জানার জন্য। তখনো আমার স্বামীর কোনো শ্বাসকষ্ট ছিল না। ভর্তি হব কোন হাসপাতালে? এক মুহূর্ত বিকল্প চিন্তা না করে আমরা ফোন করি ঢাকা সিএমএইচ এর চিফ ফিজিশিয়ান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (এখন মেজর জেনারেল) আসিফ ইকবাল ভাইকে। আমার স্বামী সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার এবং একসময় সে এই হাসপাতালেরই সিসিইউ/ আই সি ইউ’র ইনচার্জ হিসেবে কাজ করেছেন প্রায় এক যুগ। সদা হাস্যোজ্জ্বল আসিফ ভাই এক নিমিষে তাঁর সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলেন, অর্থাৎ কাল সকালেই ভর্তি এবং সিএমএইচ এর করোনো ইউনিটের প্রধান এবং পালমোনোলজিস্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজকে আমার স্বামী যে ভর্তি হবে সে কথা এখনি জানিয়ে দিবেন। সব কিছু ছিল শত ভাগ ঠিকঠাক, ক্যাপ্টেন ফাত্তাহ আমাদের দুজনকেই ভর্তি করে দিলেন নব নির্মিত অফিসার্স ওয়ার্ডে। দুপুর একটার দিকে আসিফ ভাই কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান মেজর জেনারেল আজিজুল ইসলাম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজকে নিয়ে আমার স্বামীকে দেখতে এলেন। তখনও আমার স্বামীর কোনো শ্বাসকষ্ট ছিল না। ডাক্তারদের পরামর্শ মতো বুকের সিটি স্ক্যান করানো হলো বিকেলেই। তখনো ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি যে আমরা পুরো পরিবারটি একেবারে খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়ে আছি। আরেকটু জোরে বাতাস বইলেই আমরা তলিয়ে যাবো অতলস্পর্শী অনন্ত বারিধিতে। আমরা বার বার সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট জানার চেষ্টা করি কিন্তু কেউ আর ফোন ধরে না। রেডিওলজি ডিপার্টমেন্টের অ্যাডভাইজার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুঈদ স্পষ্ট করে কিছু বলতে চায় না। রিপোর্টের কথা জিজ্ঞাসা করলেই আমতা আমতা করে অথবা অস্পষ্ট অস্বচ্ছ জবাব দেয়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুঈদ এক সময় আমার স্বামীর সাথেই কাজ করেছে একই ছাদের তলে এবং আমাদের খুবই প্রিয় মানুষদের একজন। আমার স্বামী তাদের পারিবারিক চিকিৎসক। স্পষ্ট বুঝলাম মুঈদ কিছু লুকাচ্ছে। সন্ধ্যা বেলা থেকে আমার স্বামীর চিকিৎসার ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। খারাপ কিছু যে একটা ঘটছে তা আঁচ করতে অসুবিধা হলো না। একটু পরেই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ এসে আমাকে বললেন- স্যারকে এখানে রাখা যাবে না, ভোরে কোভিড কেবিনে নিয়ে যাবো। আজিজ ভাই আমাকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে বললেন আমার স্বামীর দুই ফুসফুসের ২৫% কোভিড নিমোনিয়ায় আক্রান্ত। বুঝলাম আমার শিরেসংক্রান্তি, শিয়রে শমন। হয়তো পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। কিন্তু ঠিক সামনেই যে বিপৎসাগর তা তখনও ছিল আমার বোধের আয়ত্তের অনেক বাইরে। আমার স্বামীকে নিয়ে যাওয়া হলো কোভিড ওয়ার্ডে। ১২ থেকে ১৪ মে মোটামুটি চলছিল ভালোই কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো বিপদ্দশা নেমে এলো ১৫ তারিখ রাত থেকে। কর্ণেল জামিল ভাই এসে বললেন, ম্যাডাম স্যারের জ্বর ১০৫ ডিগ্রি। যে মানুষটি চব্বিশ ঘন্টা আগেও ছিল প্রায় স্বাভাবিক সেই মানুষটি ভোর বেলাতেই দাঁড়িয়ে গেল সাক্ষাৎ যমের সামনে। আইরিশ নোবেল লরিয়েট লেখক ডব্লিউ বি ইয়েটসের কবিতার লাইন ‘Things fall apart’ (সব কিছু ভেঙে পড়ে) এর মতো আমাদের সাজানো গোছানো চারটি মানুষের সংসারটা যেন এক সর্বনাশা সকালে আমার দু চোখের সামনে ভেঙেচূড়ে ধ্বংসোন্মুখ হয়ে গেল।

আমি ডাক্তার, শ্বাসকষ্ট কাকে বলে তা হয়তো আগে তত ভালো মত বুঝিনি, ওই দিন যেন নতুন করে বুঝলাম। আমরা যে প্রতিদিন অগুন্তিবার শ্বাস প্রশ্বাস নেই তা কী কখনো অনুধাবন করতে পারি ? তা হলে শ্বাসকষ্ট কাকে বলে? মানুষ যখন নিজে বুঝতে পারে যে, সে শ্বাস নিচ্ছে, তাকেই বলে শ্বাসকষ্ট। অক্সিজেনের খিদে যে কতোটা সর্বনাশা হতে পারে তা করোনা রোগী যারা সামনে থেকে না দেখেছে তাদেরকে বুঝানো দুরূহ। ‘There is no hunger in the world that can be compared with the severity of air hunger’. বাতাসের ক্ষুধার সাথে এ পার্থিব জগতের অন্য কোনো ক্ষুধা তুলনীয় নয়- এই আপ্তবাক্যটি যে কতোটা নির্মম সত্য সেটি আমি ওই দিনই বুঝে নিয়েছি। আসিফ ভাই আর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ ভাই আমার মেয়েকে বলে দিলেন যে তার বাবা খারাপ হয়ে গেছে, এক্ষুণি আইসিইউ’তে নিতে হবে। কর্ণেল ফয়েজ ভাই এক মুহূর্তে তাকে নিয়ে গেল, শুরু হলো যমে মানুষে দ্বৈরথ। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৭৫ থেকে ৮০র ভিতরে থাকে, শত চেষ্টাতেও তা আর উপরে ওঠে না। একেবারে রাতারাতি এই বিপত্তি। দোষ দিব কাকে ? চিকিৎসা তো ঠিকই চলছিল কিন্তু মানুষ তো এখনো প্রতাপী ভাইরাসের বিরুদ্ধে শত ভাগ সফল কোনো ব্রহ্মাাস্ত্র বানাতে পারেনি। তাই দোষ আমার নিয়তি নির্বন্ধের। সাথে সাথেই ছুটে এলেন মেজর জেনারেল আজিজুল ইসলাম,ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজ্জাক ভাইরা। জেনারেল আজিজ আমাকে সান্তনা দিয়ে বলে গেলেন, বরেন স্যারের চিকিৎসা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ, আমরা এতে হারবো না। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ আমি ও আমার মেয়েকে আশ্বাস দিয়ে বললেন অবস্থা যতেটা সংকটাপন্নই হোক না কেন, উত্তরণের ব্যবস্থা আমরা করবোই। শুধু অক্সিজেনে কোনো কাজ হচ্ছে না, আমার স্বামীকে তখন রাখা হয়েছে নন ইনভেসিভ ভেন্টিলেটরে কিন্তু আশানুরূপ উন্নতি নেই। বিকেলেই ফয়েজ ভাই অশ্রুসজল চোখ নিয়ে বললো আমাদের লাইফ সাপোর্টের অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর দিয়ে রাখতে হবে কারণ যে কোনো সময় লাইফ সাপোর্ট লাগতে পারে। আমার ছেলে সুদিপন, বোন অনির কাছে থেকে লাইফ সাপোর্টের সম্ভাবনার কথা শুনেই বাড়িতে মূর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা। এর মধ্যে এলেন কর্নেল মাসুদ মজুমদার এবং তিনিই ইনটেনসিভিস্ট হিসেবে আমার স্বামীর দেখভাল করছিলেন তখন ক্রিটিক্যাল কেয়ারে। কর্নেল মাসুদ আমাদের পূর্ব পরিচিত এবং তিনি আমার অর্ধচেতনে থাকা স্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে জোরে বললেন, স্যার আমি মাসুদ, আপনি আমাকে যেখানে রেখে গেছিলেন আমি ওই ডিপার্টমেন্টেই আছি, শুধু আপনার সাথে ছিলাম মেডিক্যাল অফিসার হিসাবে কিন্তু এখন হেড। আপনাকে আমি লাইফ সাপোর্টে দিব না, শেষ চেষ্টা করবো, কোনো অসুবিধা হবে না। আমি নিজে সব কিছু করবো এবং আমি সারারাত সারাদিন এই আইসিইউ’র উপর তলাতেই আছি। এক মিনিটে চলে আসবো। এর মধ্যে আমার মেয়ে সরাসরি সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদকে ফোন করে ওর বাবার জীবনাশংকার কথা জানিয়েছে। আমার মেয়ে সেনাপ্রধানের ছেলের বৌ’র বান্ধবী এবং তাই যোগাযোগ করা ছিল সহজ। সেনাপ্রধান আমার মেয়ের কাছে সহানুভূতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে তাৎক্ষণিক আমার স্বামীর বেঁচে ওঠার জন্য যা যা করা দরকার তা করার ব্যবস্থা করলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ আর ফয়েজ ভাই যারপর নাই চেষ্টা করে যাচ্ছেন কিন্তু অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন নেই। একেবারে পেন্ডুলামের দোলকের মতো আমার স্বামীর জীবনটা তখন জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দুলছে। সারারাত ফয়েজ ভাই ওখানেই থাকলেন। প্রতি মিনিটে মিনিটে ফোন। একবার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজ্জাক আবার আরেকবার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুন নাহার ফাতেমা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুন নাহার ফাতেমা সারারাত দু তিন ঘন্টা পর পর খবর নিতেন আমার স্বামী কেমন আছেন। এর মধ্যে রোগী যে ভালো নেই এবং যে কোনো সময় ভয়ংকর দুঃসংবাদ আসতে পারে তা আমার স্বামীর কর্মস্থল ল্যাবএইড হাসপাতালে পৌঁছে গেছে। সকাল বেলা আমাদের পারিবারিক বন্ধু সুভাষ সিংহ রায়, মোসাদ্দেক ভাই আর অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত রোগীর সু চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য করোনা রোগে ব্যবহৃত পৃথিবীর সর্বাধুনিক ওষুধ অর্থাৎ র‌্যামডিসিভিরের জন্য হন্যে হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছিলেন এবং যতোদূর জানি প্রাণ গোপাল দা নিজে ওই ওষুধ পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন হাসপাতালে। খুবসম্ভবত সে সময় ওই ওষুধটির বাংলাদেশে কোনো রেজিস্ট্রেশন ছিলো না। প্রাণ গোপাল দা, বিপ্লব দা, মোসাদ্দেক ভাই আর সুভাষ দা সিএমএইসের কমান্ড্যান্ট বিগ্রেডিয়ার জেনারেল তৌফিকের সাথে যোগাযোগ করে ওই দিনই আমার স্বামীকে র‌্যামডিসিভির ইনজেকশন দেয়ার ব্যবস্থা করেন। আমার জানা মতে আমার স্বামীই বাংলাদেশের প্রথম রোগী যাকে এই ইনজেকশনটি প্রথম দেয়া হয়েছে। কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তৌফিকের কাছে আমার ঋণ আছে অনেক। আর মেজর জেনারেল আজিজুল ইসলাম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ, লেঃ কর্নেল ফয়েজ ভাইরা একেবারে অন্তরাত্মা দিয়ে, তাদের অভিজ্ঞতার শেষ বিন্দুটুকু উজাড় করে দিয়ে আমার স্বামীকে জীবিত আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়ার যেন ব্রত নিয়েছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসিফ ভাই রোজ সকালে কিংবা দুপুরে এসে বলতেন কিচ্ছু ভাববেন না। স্যারকে আমরা উঠাবোই। আমি তো ওই আশাতেই বুক বেঁধে আছি। আমারও করোনা কিন্তু আমার অবস্থা ততো খারাপ নেই।

আরও পড়ুন:  চবিতে অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করে ডিনদের মর্যাদাহানি, সভা বয়কট

চিকিৎসায় যে বিন্দুমাত্র অবহেলা হবে না তাতে আমি শতভাগ নিশ্চিত। পালমোনোলজিস্ট আজিজ ভাই কিংবা ফয়েজ ভাইরা আমাদের ওষুধ কিংবা প্লাজমা থেরাপি কোথথেকে যোগাড় হবে, এসব কথা আমাদের সামনে তুলেই নি কখনো। সেনাবাহিনীর দুজন ডাক্তার প্লাজমা দিয়ে দিল, যাদেরকে আমার কখনো দেখিই নি। পরে ফয়েজ ভাইয়ের কাছ থেকে তাদের নাম শুনেছি, একজনের নাম মেজর মাহবুব আরেকজনের নাম মেজর ইমতিয়াজ। দুজনই ডাক্তার এবং কিছুদিন আগে এই আইসিইউ’তেই তারা মরণোন্মুখ অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁদের কাছে আমি চির কৃতজ্ঞতাবদ্ধ। ল্যাবএইড থেকে জাহের স্যার, সোহরাবুজ্জামান ভাই, আলী হোসেন ভাই সার্বক্ষণিকভাবে চিকিৎসার সমন্বয় সাধন করছিলেন। ব্রিগেডিয়ার রাজ্জাক আর বিগ্রেডিয়ার জেনারেল নুরুন নাহার ফাতেমা সারাক্ষণ যুক্ত থেকেছেন চিকিৎসার সাথে।

পর দিন ১৭ তারিখ এক সময় সন্ধ্যা নামলো। রাত বাড়ে। রাত তো বাড়বেই। আমি শুয়ে শুয়ে সুপ্রভাতের স্বপ্ন দেখি। আমি ভাবি বিখ্যাত আমেরিকান কবি হেনরি ওয়াডস্ওয়ার্থ লংফেলোর কবিতার কথাThe nearer the dawnthe darker the night.

ঊষা যতোই নিকটবর্তী হবে রাত ততোই গভীর হবে। কিন্তু ওই রাত প্রভাতের আগমনী বার্তা নিয়ে আমাদের পৃথিবীতে আসেনি, ওই রাত ছিল অভিশপ্ত রাত, ওই রাত ছিল আমার বুক থেকে আমার স্বামীকে কেড়ে নেয়ার অভিপ্রায়ের রাত, ওই রাত যেন নেমেছিল সুদি-অনির কাছ থেকে ওদের বাবা’কে বিচ্ছিন্ন করার মানসে। ওই রাত ছিল আমাদের জীবনের ত্র্যহস্পর্শের রাত, ওই রাত ছিল ঘোর অশ্লেষার রাত, সে রাত ছিল আমার, সুদি আর অনির জীবনের দুর্বহ কালবেলা। রাত দশ’টার পর থেকেই অবস্থার ক্রমাবনতি। কোনো মতেই অক্সিজেন স্যাচুরেশন ধরে রাখা যাচ্ছে না। আজিজ ভাই, মাসুদ ভাই আর ফয়েজ ভাই সবার চোখেই যেন আমি দেখতে পাচ্ছিলাম আশু পরাজয়ের প্রচ্ছন্ন আভাস। কিন্তু তারা ভাইরাসের কাছে বশ্যতাও স্বীকার করেননি কিংবা রণেও ভঙ্গ দেননি। অক্সিজেন স্যাচুরেশন কখনো কখনো ৭০ এর নিচে নেমে যাচ্ছে। আমার মেয়ে ওখানেই ছিল, কর্নেল মাসুদ এক সময় আনমনে বলে ফেললেন ‘ওনলি বাইয়িং টাইম’ অর্থাৎ লাইফ সাপোর্ট এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। এ কথা শুনেই অনি ওখান থেকে চুপচাপ সরে পড়ে। ওরা দু ভাই বোন আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে ওদের বাবাকে ওরা লাইফ সাপোর্টে দিবে না এবং অনুমতিপত্রে স্বাক্ষরও করবে না। আমি করোনায় আক্রান্ত বলে অনি সাধারণত আমার কেবিনে ঢুকে না, কিন্তু ওই দিন গভীর রাতে অনি এসে সাশ্রুনয়নে বাষ্পরুদ্ধ স্বরে শুধু বললো- মা আর কিছুক্ষণের মধ্যে বোধহয় আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। বাবাকে আমরা রাখতে পারলাম না। এ কথাটা বলে ও নির্নিশেষ আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলো। অমন করে অনিকে আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকতে আমি আর কখনো আগে দেখিনি। রোরুদ্যমান অনি তখন কী দেখছিল আমার মুখে ? হয়তো অনি বদ্ধদৃষ্টিতে চেয়েছিল তার মা’র কপালের সিঁদুরের দিকে। এই মাত্র অনি আইসিইউ’তে ডাক্তারদের শেষ কথোপকথন শুনে এসেছে, ও স্পষ্ট জানে ওর মা’র কপালের ওই লালটুকটুকে সিঁদুর আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বোধ হয় মুছে যাবে চিরকালের জন্য। এটা অদৃষ্ট, এটাই হয়তো বিধির বিধান, দৈব প্রত্যাদেশ। কিন্তু কেন যেন ওই রাতে আমার ভিতরে অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটলো। আমি অনিকে জোরের সাথে বললাম ‘তোমার বাবার কিচ্ছু হবে না, লাইফ সাপোর্ট লাগবে না’। এই কথাগুলো যেন আচম্বিতে বের হয়ে এলো আমার মুখ থেকে, যার উপর আমার আদৌ কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। মাঝে মাঝে দুর্বল মুহূর্তে কোনো কোনো মানুষের উপর মহাজাগতিক ঐন্দ্রজালিক শক্তি এসে ভর করে, তখন মানুষ বাস্তবকে অস্বীকার করার সাহস পায় অবলীলায়।আমারও যেন সেই অবস্থা। আমার স্বামী মূলত গল্প উপন্যাস লিখলেও তার গবেষণার বিষয় চিত্রকলা ও রবীন্দ্রনাথ। ক’দিন আগেও তার ল্যাপটপে আমি রবীন্দ্রনাথের ‘দুরন্ত আশা’ কবিতার চারটি লাইন দেখেছি‘মর্মে যবে মত্ত আশাসর্পসম ফোঁসেঅদৃষ্টের বন্ধনেতেদাপিয়া বৃথা রোষে….।’আমার মনেও দুরন্ত আশা। পাখির পাখা মাত্র দু’টি কিন্তু মানুষের আশার পাখা অনেক। Wings of Hope’ আশার পাখার সংখ্যা অগুন্তি। পৃথিবীতে অলৌকিক অনেক কিছুই ঘটে যা বুদ্ধির অগম্য, যুক্তিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না।Miracles Still Happen’ পৃথিবীতে অনৈসর্গিক অনেক কিছুই ঘটে,। ১৯৭১ সালে পেরুর ঘন অরণ্যের গহীনে বিধ্বস্ত হওয়া প্লেন থেকে যদি শুধুমাত্র একজন যাত্রী বেঁচে যেতে পারে তবে আমি আমার স্বামীর বেঁচে যাওয়ার আশা ছাড়বো কেন? আমার ওই আশাগুলোকে অনির কাছে স্বপ্নবৎ এবং সত্তাবিহীন বলে অনুমান হচ্ছিল। আমার শৌভিক কথা বার্তা শুনে ও ভেবেই নিয়েছিল যে, আমি আর তখন আমার মধ্যে নেই। আমার এই অতিশয় উক্তি শোনে অনির কোনো ভাবান্তর নেই। কারণ ও জানে তার মা’তো বাবার এখন কী নিদারুণ সংকটময় অবস্থা সে সম্পর্কে কিছুই জানে না। ভোর চারটার দিকে অনির ফোনটা বাজলো। আইসিইউ’র ফোন, ফোনটা অনি রিসিভ করলো না। ও বুঝে গেছে কী ঘটেছে কিংবা ঘটতে পারে। হয়তো বাবা আর নেই অথবা লাইফ সাপোর্টে। অনি এটাও জানে করোনায় লাইফ সাপোর্টে যাওয়া প্রায় মৃত্যুরই সমার্থক। অনি আমাকে কিছুই বললো না, একটা ভিনগ্রহের কায়াশূন্য আত্মার মতো একেবারে যন্ত্রচালিত রোব্টের মতো ও স্থির চোখে বের হয়ে গেল আমার রুম থেকে, দোতলার আইসিইউ’র দিকে। আমি এটা নিশ্চিত জানি যে প্রকৃত সত্যের বাস্তব রূপ কখনো কখনো বড়ো রূঢ় হয়। ঈশ্বর কী তবে এখনি আমাকে সেই প্রকৃত সত্যের রুদ্র রূপটিই দেখাবে? পনের মিনিট পরেই কর্ণেল ফয়েজকে নিয়ে অনি ফিরে এসে বললো, ব্রিগেডিয়ার আজিজ স্যার আর কর্ণেল মাসুদ স্যার এখনি বাবাকে লাইফ সাপোর্টে দিবে না। আরো দেখবে। ওষুধ আর মেশিন এডজাস্ট করার পর বাবার স্যাচুরেশন এখন ৮০ থেকে ৮৫% এর ভিতরে। আমি চেয়ে দেখলাম কিছুক্ষণ আগে দেখা অনির ফিকে নিষ্প্রভ অস্বচ্ছ অনচ্ছ মুখটি এখন হঠাৎ করেই যেন হয়ে উঠেছে স্ফটিকবৎ সতেজ। আমাকে সান্তনা দিয়ে ফয়েজ ভাই চলে গেলেন এবং যাওয়ার সময় বলে গেলেন স্যারের কোনো অসুবিধা হলে তিনি নিমেষে এসে হাজির হবেন। ফয়েজ ভাইকে নিয়ে আমার বলার বেশি কিছু নেই। এ পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের মুখের দিকে চাইলেই আঁচ করা যায় মানুষটি জীবনে কতোদূর পর্যন্ত যাবে, কর্ণেল ফয়েজ ঠিক অমনই একজন মানুষ, বেঁচে থাকলে যাবেন অনেক দূর।

আরও পড়ুন:  করো'নায় আক্রান্তে সেঞ্চুরি করলো দিনাজ'পুর

জীবন মৃত্যুর গোপন যোধনটা কার্যত শুরু হলো যেন ১৮ তারিখ সকাল থেকে। আমার স্বামীর অবস্থাটা তখন প্রায় পল্লব শিরোদেশে বৃষ্টির জলের ফোঁটাটির মতো। একবার এদিকে হেলে আরেকবার ওদিকে। এমনি টলায়মান তখন একটা মানুষের জীবন। আজিজ ভাই আর ফয়েজ ভাই যারপর নাই অনবচ্ছেদ চেষ্টা করে যাচ্ছেন কিন্তু সার্বিক অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। রোজ সকালে আজিজ ভাই হতাশ হয়ে এসে বলে- স্যারকে উঠাতে পারছি না, সবাই ভালো হয়ে চলে গেল কিন্তু বরেন স্যারকে পারছি না। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৮৫% এর আশপাশে থাকে কিন্তু ৯০ এর কোঠায় ওঠে না। এর মধ্যে একদিন সকালে সুভাষ’দা ফোন করলো কিন্তু আমার মুখ থেকে উনি একটা আর্ত চিৎকার ছাড়া আর কিছুই শুনলো না। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি আমার ছোটবেলার বান্ধবী। শুধু বান্ধবী বললে বোধ হয় বন্ধন ডোর আর হার্দিক নিগড়টা কিছুটা হলেও আলগা আর গৌণ হয়ে যায়, কারণ দীপু, ফ্লোরা আর আমি স্কুল কলেজ মেডিক্যাল অব্দি পেরিয়ে একেবারে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছি। দীপু তাৎক্ষণিক ভাবে সোহরাবুজ্জামান ভাইয়ের সাথে সমন্বয় করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমার স্বামীর চিকিৎসার তদারক করার ব্যবস্থা করেছে। সে সময় আমাদের পাশে আর তেমন কেউ ছিল না। আমার স্বামীর ভাই বোন, আমার ভাইবোন আর ভাইয়ের বৌ সারাক্ষণ আতঙ্কিত, ওই বুঝি কখন বাতাসে ভেসে আসবে দুর্বার্তা। কিন্তু আপন অভীষ্টে স্থিত ছিল অনি। সে দাদার কাছে ধনুর্ভঙ্গ পণ করেছে, যে করেই হোক বাবাকে সে জীবিত বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেই। সুদি আর অনি দুজনই জুনিয়র ডাক্তার। দাদাকে করোনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অনি এক মুহূর্তের জন্য তার বড় ভাইকে করোনা ওয়ার্ডে বাবাকে দেখতে আসতে দেয় নি। সব কিছু তুলে নিয়েছে নিজের কাঁধে। ধারণা করা যায় করোনা ক্রিটিক্যাল ইউনিটের ভিতরের অবস্থাটা কতোটা ভয়ংকর হতে পারে? চারপাশে লাইফ সাপোর্ট রোগীর এয়ারোসল, সাকশন দেয়ার সময় ছড়িয়ে পড়ছে করোনা, হাই ফ্লো মানেই চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে ভাইরাস আর তার সাথে রিব্রিদিং মাস্কের সংক্রমন এবং এরই মাঝে আমার মেয়ে পিপিই পরে বাবার মনিটরের দিকে চেয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো অহর্নিশ। আজিজ ভাই, ফয়েজ ভাই, সিস্টাররা আর মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টরা সবাই অনিকে ভয় দেখিয়েছে কিন্তু অনি কারুর কথায় অণুমাত্র কর্ণপাত করেনি, কর্তব্যে ও ছিল স্থিরচিত্ত আর নিঃশঙ্ক অশঙ্ক। আমি সে সময় অনির ভিতর সব সময় একটা উন্মনা উদ্বেগি ভাব দেখতে পেতাম। প্রতিদিন গভীর রাতে দু এক ঘন্টার জন্য ও ল্যাবএইডে যেত খাওয়া আর স্নান করার জন্য, সেটুক সময়ও ওর মন থাকতো উতলা অস্থির। ওর মনে নানামুখী ভয়, ওই বুঝি বাবার নাকের হাই ফ্লো বন্ধ হয়ে গেল, এনআইভিটা বোধ হয় ঠিকমত কাজ করছে না, অক্সিজেন ডেলিভারি সিস্টেমের জলের পরিমান বুঝি ওই শেষ হয়ে গেল, বাবা কী বেড থেকে নিচে পড়ে গেল- ঠিক এরকম নানাধরনের ‘যদি’ সদা ঠাসাঠাসি করতো ওর মস্তিষ্কের অযুত নিযুত স্নায়ু সন্নিকর্ষে। সে সময় আমাদের লজিস্টিক সাপোর্টের দরকার ছিল। কারণ করোনা এমন একটি রোগ যা ক্যান্সার কিংবা এইডসের চেয়েও অধিক অপঘাতী আর ধ্বংসী। একান্ত আপনজনও রোগীর সামনে যায় না প্রাণ ভয়ে। আমাদের পারিবারিক বন্ধু ডা. খায়ের ভাই টেলিফোনে সারাক্ষণ অনিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন, কখন কী করতে হবে।

লেখক: এমবিবিএস (ডিএমসি), ডিজিও (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), এমসিপিএস (গাইনী), এফসিপিএস (গাইনী), ডিপার্টমেন্ট অব গাইনোকোলজি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।