প্রচ্ছদ এডিটরস পিক

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা

27
ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

শাহেদ কায়েস

দুর্যোগের তিন মাসেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি উপকূলবর্তী অঞ্চলের মানুষজন। এখনো জোয়ারের সময় পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি, আবার ভাটায় ভাসে। জোয়ার-ভাটায় এভাবে পানি ওঠানামা করছে আশাশুনির প্রতাপনগর ও আশপাশের গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের বসতবাড়িতে।

প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে আছে উপকূলবর্তী এই অঞ্চলের মানুষ। ছোটবেলা থেকে লড়াই করতে করতেই বেড়ে ওঠে তারা। নদীভাঙন উপকূলীয় মানুষের কাছে নতুন কোনো ঘটনা নয়। আম্ফানের আগেও আইলা, সিডরসহ বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগে একাধিকবার ভেঙেছে তাদের ঘরবাড়ি, সাজানো সংসার, ভেঙেছে স্বপ্ন। ২০০৯ সালে আইলার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে নতুনভাবে বাঁচতে শুরু করেছিল তারা। কিছুটা হলেও অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ। এরই মধ্যে গত মে মাসে আম্ফান আঘাত হেনে ফের তছনছ করে দিল সবকিছু। একদিকে করোনার মহামারি, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত সাতক্ষীরা। আম্ফানে উপকূলীয় বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। এখন চলছে শুধু কোনো রকমে বেঁচে থাকার লড়াই।

বেশির ভাগ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। এই অঞ্চলের মানুষ প্রধানত বাইরে থেকে আয় করে আনে। তারা শ্রমিক হিসেবে বাইরে যায়। যেমন—কৃষি শ্রমিক মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনা—এসব জেলায় জন খাটতে যায়। বছরে দুইবার—শীত ও গরমের মৌসুমে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে তারা জন খাটে দুই মাসের মতো। দিনমজুরি করে ধান পায় ২০-২২ বস্তা। আবার ধান রোপণের সময় তারা মজুরি হিসেবে টাকা পায় মালিকের কাছ থেকে। তারাই আবার যখন গ্রামে থাকে বছরের অন্য সময়গুলোতে, তখন সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরে, মধু আহরণ করে, কেউ বা গোলপাতা কাটতে যায়। প্রতাপনগর গ্রামে মৌয়ালি আছে শতাধিক। প্রতিবছর মার্চের পরে তিন-চার মাস সরকার পাস দেয়। তখন মৌয়ালিরা সুন্দরবনে গিয়ে মধু সংগ্রহ করে। প্রতাপনগর থেকে তিন ঘণ্টা লাগে ট্রলারে সুন্দরবন যেতে। এ ছাড়া অনেকেই ঢাকা, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় ইটভাটায় পাঁচ-ছয় মাস শ্রমিক হিসেবে কাজ করে।

আরও পড়ুন:  বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

নিরাপদ আশ্রয় মানে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল এবং এলাকার যেসব ধনাঢ্য ব্যক্তি আছেন তাঁরা মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন। প্রতাপনগর গ্রামের অদূরেই দেখা যাচ্ছে ইটের কঙ্কাল। এগুলো হচ্ছে বাস্তুহারাদের জন্য সরকার নির্মিত সারি দেওয়া বেশ কিছু ঘর। ঘরগুলো প্রস্তুত। উদ্বাস্তু মানুষগুলোকে ওখানে ঘর দেওয়া হবে। কিন্তু তার আগেই আম্ফান ঝড় শুরু হলে আর তাঁদের হস্তান্তর করা সম্ভব হয় না। আম্ফানে লণ্ডভণ্ড হয়ে চাল উড়ে গেছে, দেয়ালগুলো ধসে গেছে।

এ অঞ্চল আম্ফানে আক্রান্ত হওয়ার এক সপ্তাহ পর্যন্ত সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো ত্রাণ আসেনি। আইলার চেয়ে আম্ফানে এ অঞ্চলের মানুষজন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইলায় বাঁধ ভেঙেছিল খোলপেটুয়া নদীর এক জায়গায়। কিন্তু আম্ফানে দুই নদীর বাঁধই ভেঙেছে। গত তিন মাসে এখানকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দুই দফায় মাত্র ২০ কেজি করে চাল পেয়েছে, যা তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজনের চেয়ে খুবই সামান্য।

একসময় উপকূলবর্তী এই অঞ্চল ছিল কৃষিপ্রধান। কৃষিকাজ, বিশেষ করে সবজি ও ধান চাষ ছিল এদের জীবিকার অন্যতম উৎস। সেই সময়টাকে এ অঞ্চলের কর্মজীবী সাধারণ মানুষ মনে করে ‘সোনালি সময়’। এখন ধান চাষ হয় খুব কম জমিতে। সবই ঘের দিয়ে চিংড়ি চাষ হয়। ধান চাষ হলে শ্রমজীবী মানুষের কাজের সংস্থান হয় এখানেই। বেশির ভাগ পরিবারকে আর বাইরে যেতে হয় না। তারা তাদের খাদ্য এখান থেকেই জোগাড় করে নিতে পারে। এ অঞ্চলে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ, যারা চিংড়ির ব্যবসা করে, তারা ধনী। অন্যরা দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবন ধারণ করছে। এখানে পাঁচ বিঘা, চার বিঘা জায়গা নিয়ে একেকটা ঘের। একটা ঘেরে মাত্র এক থেকে দুজন মানুষের কর্মসংস্থান হয়। আর এ পরিমাণ জমিতে যদি ধান চাষ করা যেত, তাহলে তিন-চারটি পরিবার এখানে কাজ করার সুযোগ পেত। অনেক বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হতো।

খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষের বাঁধগুলো খুবই দুর্বল। এখানে সরকার থেকে টেকসই বাঁধগুলো নির্মাণেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। ঝড়ে-বন্যায় ভেসে যায় এ অঞ্চলের মানুষের বাসস্থান, জীবন-জীবিকা। বাড়ির উঠানে পানি, ঘরেও পানি। খাদ্যের সঙ্গে আছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। এভাবে চরম দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে সেখানকার মানুষ। ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’-এর তাণ্ডবে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবন বুক পেতে ঢাল হয়ে ঝড়ের গতি কমিয়ে না দিলে জান-মালের ক্ষতি হতো আরো অনেক বেশি। এক যুগ আগে ঘূর্ণিঝড় সিডরও আছড়ে পড়েছিল সুন্দরবনের ওপর, যা রক্ষা করেছিল উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা।

আরও পড়ুন:  শেখ হাসিনার নেতৃত্ব কেন অপরিহার্য

সুন্দরবন কি সময় পাবে সিডর, আইলা ও বুলবুলের আঘাতের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো আম্ফানের ক্ষয়ক্ষতিও কাটিয়ে উঠতে?

ঝড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার অন্যতম একটা কারণ হচ্ছে ওয়াপদার কাছাকাছি চিংড়িঘের। এখানে আছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এই উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয় বেশির ভাগ চিংড়িঘের সেই ওয়াপদার পাশ থেকেই শুরু। চিংড়িঘের মালিকরা ওয়াপদা ছিদ্র করে পানি আনেন। ফলে বাঁধের দুই পাশে পানি থাকে। যেহেতু এখানে দোআঁশ মাটি, এ জন্য মাটি খুব দুর্বল। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, ঝড়ে বাঁধ ভাঙা রোধ করতে হলে বাঁধের ভেতর গ্রামের দিকে ওয়াপদা থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে চিংড়িঘের বন্ধ করতে হবে। বাঁধগুলোকে আরো টেকসই করে নির্মাণ করতে হবে, যাতে ঘূর্ণিঝড়ে সহজে ভেঙে না যায়। সেই সঙ্গে এ মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে আম্ফান দুর্গত এলাকায় যত দ্রুত সম্ভব খাদ্য সহায়তা পাঠাতে হবে। আর খোলপেটুয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদে বাঁধ পুনর্নির্মাণ করতে হবে।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 4
    Shares