প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত

অনন্য রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদ সাইফুর রহমান

28
অনন্য রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদ সাইফুর রহমান
পড়া যাবে: 4 মিনিটে

আহবাব চৌধুরী খোকনবাংলাদেশের ক্ষণজন্মা রাজনীতিবিদ ও অর্থনৈতিক সংস্কারক, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ৫ সেপ্টেম্বর। ২০০৯ সালে মৌলভীবাজার থেকে ঢাকা আসার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অসম্ভব মেধাবী, সৎ এবং দেশপ্রেমিক। প্রতিভাবান এ মানুষটির জন্ম ১৯৩২ সালের ৬ অক্টোবর মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দন গ্রামে। বাবা মরহুম আব্দুল বাসিত ও মা তালেবুন নেছা দম্পতির প্রথম সন্তান সাইফুর রহমান ১৯৪৯ সালে মৌলভীবাজার সরকারি স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন, ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে আইএসসি ও ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি নির্বাচিত হন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাভোগ করেন। ১৯৬২ সালে শিক্ষাজীবন শেষে দেশে ফিরে আত্মপ্রকাশ করেন একজন চৌকস অ্যাকাউন্টেন্ট হিসাবে। প্রতিষ্ঠা করেন ‘রহমান, রেহমান অ্যান্ড হক’ নামে একটি নিরীক্ষণ ফার্ম। এটি এখনো দেশে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আদর্শ ও প্রথম শ্রেণীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যা সাইফুর রহমানের কৃতিত্বের স্মারক বহন করে।

১৯৭৬ সালে সাইফুর রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন একজন নেতা। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনেপ্রাণে বিএনপির রাজনীতিকেই লালন করে গেছেন। প্রথমে জিয়াউর রহমান সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ও পরে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার সরকারের অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে ২৪ মার্চ সামরিক শাসন জারি করে স্বৈরাচারী এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর শুরু হয় নির্যাতন। এ সময় বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের প্রায় সব নেতার সাথে সাইফুর রহমানকেও গ্রেফতার করে সীমাহীন নির্যাতন করা হয়। এরশাদের জুলুম নির্যাতনের মুখে বিএনপির অনেক নেতা স্বৈরাচারী সরকারের সাথে আপস করে মন্ত্রী হলেও তিনি আপস করেননি। এ সময় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ভেঙে দ্বিখণ্ডিত হলে সাইফুর রহমান শহীদ জিয়ার সহধর্মিনী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি রাজপথে থেকে সাহসিকতার সাথে সরকারের জুলুম নির্যাতন মোকাবেলা করেন। ১৯৯০ সালে ছাত্র গণআন্দোলনের মুখে এরশাদের পতন হয়। সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। সাইফুর রহমান আবারো দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুই দফায় ১০ বছর বেগম খালেদা জিয়া সরকারের অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আরও পড়ুন:  কারাবন্দীর ২ বছর ইসহাক সরকার এর জামিন হচ্ছে না কেনো ?

তিনি ছিলেন সৎ, মেধাবী, সাহসী, দেশপ্রেমিক ও স্পষ্টবাদী। যতটুকু মনে পড়ে মৃত্যুর বছর চারেক আগে তার সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল। ২০০৫ সালের নভেম্বরে দেশে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তিনি ঈদের দিন সকালে সিলেট শাহি ঈদগাহ থেকে ঈদের নামাজ পড়ে মৌলভীবাজার যাচ্ছিলেন। আমি তার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব (এপিএস) কাইয়ুম চৌধুরীর সাথে তাকে ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজার পৌঁছে দিয়ে এসেছিলাম। তখন তার সাথে ছিলেন সিলেট ও মোলভীবাজারের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও তৎকালীন সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ দিন অন্যান্য ঈদের দিনের মতো মৌলভীবাজারে তার বাগানবাড়িতে জনতার ঢল নেমেছিল। দেখলাম তিনি বেশ ক্লান্ত। তাই অন্যান্য দিনের মতো বেশিক্ষণ বাগানবাড়িতে থাকতে চাননি। সবার কাছে বিদায় নিয়ে গেলেন বাহারমর্দনে পৈতৃক বাড়িতে। সিলেটে এলে তিনি তার বাবার স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িতেই রাত্রি যাপন করতেন।জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একজন অনুসারী হিসেবে আদর্শ এই মানুষটির সাথে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল এই দশ বছর অসংখ্যবার তার সাথে বিভিন্ন সভা- সমাবেশে মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জে সফরসঙ্গী হওয়ার সুযোগ হয়েছে। সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক ও পরবর্তীতে সিলেট জেলা বিএনপির সাংস্কৃতিক ও আপ্যায়ন সম্পাদক হিসেবে ১৯৯৩ থেকে ২০০১ পর্যন্ত স্যারের সব কর্মসূচিতে থাকার সুযোগ পেয়েছি।

সিলেট বিভাগ প্রতিষ্ঠায় সাইফুর রহমানের ভূমিকা ভোলার নয়। তখন সিলেটে বিভাগ প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন চলছে। এটি গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে সব স্তরের মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দিয়ছে। ১৯৯৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সিলেটে আসবেন। আলীয়া মাদরাসা মাঠে জনসভার আয়োজন চলছে। সিলেট জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সাইফুর রহমান সভার এক দিন আগে সিলেট এসে পৌঁছেন। এই সময় সিলেটের মানুষের সেন্টিমেন্ট বুঝতে পেরে তিনি সিলেট থেকে ফোন করে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন আপনি যদি আগামীকালকের জনসভায় সিলেটকে দেশের নতুন বিভাগ হিসেবে ঘোষণা না দেন; তাহলে আমি আপনার মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করব। শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অর্থমন্ত্রীর কথামতো বিশাল জনসভায় সিলেটকে দেশের নতুন বিভাগ হিসেবে ঘোষণা দেন। এভাবে সাইফুর রহমান তখনকার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে থেকে সিলেট বিভাগ প্রতিষ্ঠাসহ সিলেটের অনেক উন্নয়ন আদায় করে নেন।

১৯৯৭ সালের কথা। আওয়ামী লীগ তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। সুযোগ হয়েছিল তার সাথে ঢাকা থেকে সকালের পারাবত ট্রেনে শ্রীমঙ্গল যাওয়ার। স্যারের সাথে সফরসঙ্গী জনাব কাইয়ুম চৌধুরী ও আমি। পারাবত ট্রেনের একটি ডাবল কেবিনে আমরা ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে একসাথে শ্রীমঙ্গল যাচ্ছি। স্যার ট্রেনে উঠেই ঘুমিয়ে পড়েন। আমি ও কাইয়ুম চাচা তার সামনের সিটে বসে আস্তে আস্তে গল্প করছি। ট্রেন চলতে চলতে আখাউড়া স্টেশনে এসে থামলে লোকজনের চিৎকারে স্যারের ঘুম ভেঙে যায়। জানতে চাইলেন ট্রেন এখন কোথায় আছে। বললাম আখাউড়া। তিনি বললেন, ‘এই একটি স্টপেজ আমাদের লাইনে অযথা রাখা হয়েছে ও এতে প্রতিটি যাত্রীর ক্ষতি হয় এক ঘণ্টা। লাভ হয় চোরাকারবারিদের। অথচ এখানে মাত্র অর্ধ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করতে পারলে ট্রেন সোজা সিলেট চলে যেতে পারে। ইঞ্জিন ঘুরানোর জন্য এখানে থামতে হতো না। মনে রেখো আল্লাহ যদি কখনো আমাকে আবার সুযোগ দেন; এখানে ইঞ্জিন ঘুরানোর সুযোগ রাখব না।’ পরে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি আবারো ক্ষমতায় এলে সাইফুর রহমান অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হন এবং আখাউড়ায় সিলেটের মানুষের সুবিধার্থে এক কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করে তার সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। ঢাকা থেকে সিলেট এবং সিলেট থেকে ঢাকাগামী সব ট্রেনের স্টপেজ আখাউড়া থেকে উঠিয়ে দেয়া হয় যা আজো বহাল আছে। এখনো ট্রেনে করে ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার সময় আখাউড়া গেলেই স্যারের এ কথা মনে পড়ে।

আরও পড়ুন:  মা খুব বাজে বাজে পিক পাঠায়

সাইফুর রহমান মন্ত্রী থাকাকালে উন্নয়নের ব্যাপারে পালন করেন বিস্ময়কর কৃতিত্ব। মনে আছে, ১৯৯১ সালে সরকারের সময় আমরা স্যারের সাথে রাজনগরে জনাব রাগীব আলীর চা বাগানে দুপুরের লাঞ্চ করে রওয়ানা হলাম ফতেহপুর বাজারে। ফতেহপুর সিলেট এবং মোলভীবাজারের বর্ডার। ফতেহপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন তখন জামী আহমদ। আমরা স্যারের সাথে গাড়িবহর নিয়ে যখন ফতেহপুর যাচ্ছিলাম তখন কাঁচা এ রাস্তার অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল সড়ক নয়; যাচ্ছি যেন হাওয়া দিয়ে। তিনি স্পট পরিদর্শনে করলেন, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্টদের সাথে পরামর্শ করলেন, জনসভায় প্রদত্ত বক্তৃতায় জনগণের দাবির মুখে এ রাস্তা করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি তখন টেকনোক্রেট মন্ত্রী। আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম আজিজুর রহমান ছিলেন মৌলভীবাজার সদরের এমপি। এই মিটিংয়ের প্রায় বছরখানেক পরে সাইফুর রহমান আবারো ফতেহপুর গেলেন ওই রাস্তা উদ্বোধনে। এক বছরের মধ্যে কী অপূর্ব রাস্তা। না দেখলে বিশ্বাস হবে নয়।

মরহুম সাইফুর রহমানকে নিয়ে এমন অনেক স্মৃতি রয়েছে যা কখনো ভোলার নয়। তিনি ছিলেন জনবান্ধব নেতা। সিলেট বিভাগসহ দেশের অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়নে রেখেছেন কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি তার কর্মের জন্য এ দেশের মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন দীর্ঘদিন।

লেখক : সেক্রেটারি, এম সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ, নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 30
    Shares