প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জেলা

‘বই পাগল’ এক হকারের গল্প

18
‘বই পাগল’ এক হকারের গল্প
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি

চোখে-মুখে অভাব অনাটনের ছায়া। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ মেইন বাসস্ট্যান্ডে কখনও তিলের খাজা, কখনও ঝুরি ভাজা, কখনও হাতপাখা-রুমাল, আবার কখনও কলা কিংবা অন্যান্য ফলমূল ফেরি করে বিক্রি করেন। হতদরিদ্র মানুষটি শেষ কবে নিজের গায়ের পোশাক কিনেছেন তাও বলতে পারেন না। প্রাইমারি পর্যন্ত লেখাপড়া করলেও অভাব অনাটনের কারণে আর পড়তে পারেননি। কিন্তু নিজ উদ্যোগে অনেক বই পুস্তক পড়ে নিজেকে শিক্ষিত করে তুলতে কার্পণ্য করেননি। তিনি হলেন স্থানীয়ভাবে ফেরিওয়ালা নামে পরিচিত মিরাজুল হক। নিজে দুবেলা দুমুঠো খেতে না পারলেও অর্থের অভাবে শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়া মানুষগুলোকে বই পড়ার মাধ্যমে মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান তিনি। জানা গেছে, হকারি করে প্রায় আড়াই লাখ টাকা দিয়ে কিনেছেন চার শতাধিক বিভিন্ন প্রকারের বই। এখন একটি পাঠাগার স্থাপনের অপেক্ষায় আছেন তিনি।

মিরাজুল মনে করেন, পাঠাগার থাকলে এলাকার গৌরব উজ্জ্বল হয়। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে ও জানাতে ভূমিকা পালন করে একটি পাঠাগার। এমন উপলদ্ধি থেকে তিনি নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগার। কিছুদিন নিজ ব্যয়ে পাঠাগারটি চালানোর পর এখন অর্থ, জায়গা আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পাঠাগারটি চালাতে পারছেন না। পাঠাগারের অভাবে চার শতাধিক বই বাড়িতেই বাক্সবন্দি করে রেখেছেন। অনুযোগের সুরে তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্টের পরও বঙ্গবন্ধুর নামে স্থাপিত পাঠাগারটি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আলোর মুখ দেখছে না।’  তিনি চান পাঠাগারটি আলোর মুখ দেখুক। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জ্ঞান অন্বেষণে পাঠাগারে এসে মিলন মেলার বন্ধনে আবদ্ধ থাকুক। ফেরিওয়ালা মিরাজুর হক ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের কলেজপাড়ার মৃত ইব্রাহিম মোল্ল্যার ছেলে। স্ত্রী জুলেখা বেগম, দুই ছেলে আর দুই মেয়েকে নিয়ে তার পরিবার। দুই মেয়ে শারমিন সুলতানা মিনা ও পারভিন সুলতানা মুক্তার বিয়ে হয়ে গেছে। দুই ছেলে জাহাঙ্গীর আলম ও আলমগীর মোল্ল্যাা। বড় ছেলে জাহাঙ্গীর আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করে বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছেন। আর ছোট ছেলে আলমগীর মোল্ল্যাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বধর্ম ও সাংস্কৃতি বিষয়ে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রের প্রিমিয়ার লীগের নিয়মিত ফুটবল খেলোয়াড়। 

আরও পড়ুন:  মোরেলগঞ্জে ১০ টাকার চালে গরীবের মুখে হাঁসি

মিরাজুল হক বলেন, অভাব অনাটনের জন্য তিনি লেখাপড়া করতে পারেননি। কোন রকম প্রাইমারি শেষ করে ১৯৭৮ সাল থেকে কালীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে হকারি করে জীবীকা নির্বাহ করছেন। বর্তমানে মাসে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় হয়। তাই দিয়ে সংসার চালানোসহ ছেলেদের লেখাপড়া শেখানো ও মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। লেখাপড়া শিখতে না পারার আক্ষেপ থেকেই তিনি ছোট বেলায় বিভিন্ন রকমের বই পড়তে থাকেন। আর সেখান থেকেই বই কেনার নেশায় পড়েন। বঙ্গবন্ধুর প্রতিও রয়েছে তার অগাধ ভালবাসা। নিজেকে তিনি বই প্রেমিক ও বঙ্গবন্ধুর সৈনিক বলে দাবি করেন। ২০১৫ সাল থেকে তিনি পুরো দমে বই কেনা শুরু করেন। রকমারি ডটকম ও সলেমানিয়া বুক ডিপো থেকে তিনি বইগুলো কিনেছেন। দুইশ’ টাকা থেকে শুরু করে ১২শ’ টাকা দামের বইও কিনেছেন তিনি। দেশ বিদেশের খ্যাতিমান লেখকসহ তার সংরক্ষণে বিভিন্ন লেখকদের চার শতাধিক বই রয়েছে।

২০১৫ সালের মার্চ মাসে শহরের কলাহাটা মোড়ে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগার প্রতিষ্ঠাও করেন। ঝিনাইদহ-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ও কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল আজীম আনার সেই পাঠাগারটি উদ্বোধনও করেন। প্রথম কয়েকবছর নিজ অর্থে পাঠাগারটি চালালেও পরে অর্থ, জায়গা ও পৃষ্টপোষকতার অভাবে পাঠাগারটি আর চালাতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘শহরের অনেক স্থানে খাস জমি রয়েছে। আমি চাই সেখানে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি পাঠাগার করা হোক।’ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা বাবু মণ্টু গোপাল বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগার খুবই  প্রয়োজন। ফেরিওয়ালা মেরাজুল হক পাঠগারটি দাঁড় করাতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এটা আলোর মুখ দেখছে না।’ কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুবর্ণা রানী সাহা জানান, ফেরিওয়ালা মিরাজুল হক যে কাজটি করছেন তা খুবই ভালো কাজ। পাঠাগারের জায়গার জন্য মিরাজুল যে আবেদন করেছেন, সেই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আবেদনের বিষয়টি আমার চোখে পড়েনি। আবারও আবেদন করলে বিষয়টি আমি আন্তরিকতা সঙ্গে দেখবো।’

আরও পড়ুন:  খুলনা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা

কালীগঞ্জ পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুল আলম আশরাফ বলেন, ‘যেহেতু বঙ্গবন্ধুর নামের পাঠাগার, সেহেতু আমাদের একটা দায়িত্বও আছে। এজন্য মিরাজুল হককে পাঠাগারের জন্য আমি একটি অস্থায়ী অফিস দিয়েছিলাম। কিন্তু কী কারণে সেখানে পাঠাগারটি রাখেনি তা আমি জানিনা।’

তিনি আরও জানান, এমপি মহোদয়সহ আমরা যারা আছি তাদের সমন্বয়ে কাজটি করতে পারলে পাঠাগারটি স্টাবিলিস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সে নিজেই কমিটির সভাপতি। তারপরও দেখবো কীভাবে পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করা যায়।’ 

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 4
    Shares