প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত

বোরকা বা হিজাব কি নারীর চয়েস?

7
Women Chapter
পড়া যাবে: 4 মিনিটে

কাজী তামান্না কেয়া:

ষাট বছরের প্রৌঢ়া সুরাইয়া খাতুন বিকেলে হাঁটতে বের হন। জুন-জুলাইয়ের ভ্যাপসা গরমেও সে শাড়ির উপরে একটা ওড়না পরে বের হন। ছোট মেয়ে নিষেধ করে শাড়ির উপর বাড়তি পোশাক জড়াতে। উনি যুক্তি দেখান, আমার বয়স হয়েছে। এ বয়সেও পার্ক থকে ফেরার পথে কিছু লোক বাজে চোখে তাকায়। তাছাড়া তার সাথে যে নারীরা হাঁটেন, তাদের কেউ বোরকা পরেন, কেউ ওড়না পরেন, কেউ বোরকা, ওড়না এবং হিজাব সব পরেন। এখন তিনি যদি অন্তত ওড়নাটা না পরেন, তাকে দলছুট দেখায়। সেই ভাবনা থেকেই প্রথম প্রথম শুধু শাড়ির উপর দিয়ে ওড়না টেনে বেরিয়ে পরতেন। এখন অন্যান্য কাজে বের হলেও পরেন। মেজো মেয়ে স্বামীসহ সম্প্রতি হজ করে এসেছে। সে তো বিয়েশাদিতে বা অন্যান্য পারিবারিক অনুষ্ঠানে সুরাইয়া খাতুন হিজাব পরে না গেলে মাকে ফোন দিয়ে রাগারাগি করে। সুরাইয়া খাতুন সারাজীবন শাড়ি পরে কাটিয়েছেন। মুরুব্বি কেউ উপস্থিত থাকলে হয়তো মাথায় কাপড় টেনে দিয়েছেন। পর্দা বলতে এটুকুই করে এসেছেন এতোকাল। এখন দিন বদলে গেছে। পেটের সন্তান ঠিক করে দেন মাকে এই বয়সে কী পোশাকে চলতে হবে।

বৃষ্টির বয়স সতেরো- কলেজে পড়ে। ঢাকার কাছে সাভারে থাকে। একমাত্র মেয়েকে অনেক লেখাপড়া শিখিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে তবে বিয়ে থা দেবেন, এমনটা বাবা-মায়ের ইচ্ছা। বৃষ্টির বাবা মেয়েকে নিয়ে সদা চিন্তিত থাকেন। দিনকাল খারাপ, বলা যায় না কখন কার নজরে পড়ে। চিন্তাগ্রস্ত বাবা মা তাই মেয়েকে বোরকা পরিয়ে, নেকাবে মুখ ঢেকে এরপরে কলেজ এবং কোচিং এ পাঠান। বৃষ্টির এসব পরতে ভাল লাগে না। একেতো কলেজের পোশাকে বেল্ট, কেডস জুতা সব পরতে হয়, তার উপরে মাথা ঢেকে এবং পুরো শরীরে আরও পাঁচ/ছয় বাড়তি কাপড় পরতে হয় বাবা মায়ের চাপে। মাঝে মাঝে মনে হয় কলেজ থেকে ফেরার পথে রাস্তার মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে যাবে। কয়েকদিন আগে বৃষ্টির বান্ধবী জ্ঞান হারিয়েছিল বাসের ভেতর গরমে। সেই থেকে বৃষ্টির বাবা ছোট চাকুরি করা সত্ত্বেও মেয়ের অনুরোধে প্রতিদিন ৬০/৭০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে দেন।

লোপার স্বামী ইতালি থাকেন। স্বামী দেশে এলে সুন্দর সুন্দর গাউন, লো কাট টপ্স, শোল্ডার ডাউন টিউনিক নিয়ে আসেন। লোপার সেসব পোষাক পরে বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় না। আগে বান্ধবীদের সাথে রেস্টুরেন্টে গিয়ে ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরা ছবি মাঝে মধ্যে ফেইসবুকে আপ্লোড করতো। শ্বশুরকুলের আত্মীয় স্বজনের কথার মুখে এখন সেসব আর আপ্লোড করেন না।। শাশুড়ি কিছুদিন বোরকা পরতে চাপ দিয়েছিলেন। স্বামীর সাথে কথা বলে শাশুড়ি মুখ বন্ধ করেছেন। বাংলাদেশে থাকার ইচ্ছা উঠে গেছে লোপার। ভিসা পেলে সেও চলে যাবে ইতালি। পোশাক নিয়ে হেনস্থা করা সমাজের উপর থেকে একেবারে মন উঠে গেছে তার।

আরও পড়ুন:  ‘শকুন্তলা দেবী’ শুধুই কি একজন গণিতজ্ঞ বা একটি চরিত্র?

আমেনা বেগমের বয়স ৩৬ বছর। তার সৌদি প্রাবাসী স্বামী্র সংসার একা সামলাচ্ছেন আজ ১৬ বছর। তিন ছেলেমেয়ের সংসারে বাজার করা, উপজেলায় গিয়ে স্বামীর পাঠানো টাকা তোলা, ছেলেমেয়ের জামা-জুতা-বই কেনা থেকে বৃদ্ধা শাশুড়ির দেখভাল করা, সব কিছু এক হাতে করেন তিনি। আগে বোরকা ছাড়াই বাইরে যেতেন। স্বামীর নির্দেশে বোরকা ধরেছেন তিনি। আমেনা খাতুন একা নন, তার পাড়ায় যত অবিবাহিত নারী আছে, উপজেলা বা সদরে কেনাকাটা করতে গেলে সবাই বোরকা পরে যায়। নইলে নানান লোকে নানান ধরনের মন্তব্য করে। বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হলে যাতায়াতের পথে লোকের টিটকারি শুনতে হয়।

হাবিবা তার এক বছর বয়সী সন্তান হারানোর পর স্বামীসহ উমরা করে আসেন। আগে পর্দা না করলেও এখন তিনি হিজাব এবং বোরকা পরেন। সেদিন একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। ননদরা বললো ভাবী বোরকা খোলো। কিন্তু হাবিবার এখন বোরকা ছাড়া বাইরে আসতে ভালো লাগে না।

উপরের সবগুলো ঘটনা বাস্তব থেকে নেওয়া। এখানে বোরকা হিজাব হয় স্বামী, নয় সমাজ, নয় ধর্ম, বা এর সবগুলো কারণের সমষ্টি। এখানে চয়েসের চেয়ে বিভিন্ন বয়সী নারী বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বোরকা বা হিজাব ধরেছেন। নারীর গায়ে এই আবরণটি আছে বলেই সহজে বলে দেওয়া যায় যে বোরকা তাদের চয়েস। কিন্তু কেন বোরকা চয়েস হতে পারে না, আসুন দেখি–

১) চয়েস হলে নারী ইচ্ছে হলে বোরকা পরবে আর ইচ্ছে হলে পরা থেকে বিরত থাকবেন। বাস্তবে একবার বোরকা পরা শুরু করলে, তা ছাড়া এতো সহজ নয়।বোরকা পরে ছেড়ে দিলে নানান রকমের পারিবারিক এবং সামাজিক গঞ্জনার শিকার হতে হয় নারীকে। আর কোন পোশাক পরার এমন বাধ্য বাধকতা আছে কি?

২) বোরকা পরা যদি চয়েস হতো তাহলে অন্য দেশের নারীদের আমরা তা পরতে দেখতাম। এমেরিকায় মাস্টার্স করার সময় আমি আমার এমেরিকান বান্ধবীদের জন্যে শাড়ি ইভেন্ট করেছিলাম কারণ তারা সবাই শাড়ি পরতে চেয়েছিল। আমাকে কেউ একটা বোরকা ইভেন্ট দেখাতে পারবেন যেখানে ভিনদেশী নারীরা বোরকা পরে আনন্দ করবেন? আসল কথা বোরকা কোন সাধারণ পোশাক নয়, এটা ধর্মের চিহ্ন। এই চিহ্ন কেউ ইচ্ছে করে গায়ে চাপায় না, তাকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। চয়েস হলে অন্য দেশের, অন্য ধর্মের নারীরাও পরতেন, শুধু মুসলিম নারীরা নয়। বাংলাদেশের কম বয়সী মেয়েরা বা ভার্সিটির হলের মেয়েরা হাঁটু পর্যন্ত স্কার্ট, লেগিংস, পালাজ্জো, টি শার্ট এইসব পোশাক পরে। এই পোশাকগুলি তাদের চয়েস। এখন পরছেন, মন না চাইলে পরবেন না। এখানে পারিবারিক কিংবা সামাজিক বাধ্যবাধকতা নিতান্তই কম।

আরও পড়ুন:  শয়তান মেয়ের অর্থনীতি সমাচার

৩) বাংলাদেশের নারীদের ক্ষেত্রে বাবা, স্বামী বা ছেলে—এই তিন পুরুষের অনেক ক্ষমতা। তারা তাদের অধীনস্ত নারীদের বোরকা পরতে উদ্বুদ্ধ করে থাকেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বলেই মাদ্রাসায় পড়া ১২ বছরের ছেলেটি মাকে বাইরে গেলে হিজাব বোরকা পরতে বলে। অথচ ১২ হাত শাড়ি, পা পর্যন্ত লম্বা ম্যাক্সি, কিংবা সালোয়ার কামিজ শরীর ঢাকার জন্যে যথেষ্ট ছিল।

৪) ইরানে মাথা ঢাকার আইন জারি আছে। ইরানী নারীরা মাথা না ঢাকলে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায় বা মাথায় ঘোমটা দিতে বাধ্য করে। ঐ দেশের নারীরা বহু বছর ধরে আন্দোলন করছে মাথা খোলা রাখার অধিকার চেয়ে, এখনও পায়নি। নারী বলেই তো ইরান এইসব চাপিয়ে দিতে পারছে ধর্মের নামে। একই রকমভাবে সৌদী আরবে ঘরের ভেতরেও ঢোলা আবায়া পরতে হয় নারীদের। বাইরে যে পরতে হবে তাতে কোন সন্দেহই নেই। সেখানেও আবায়া না পরলে বাড়ির পুরুষ সদস্যরা নারীদের পেটান। বাইরে গেলে অন্য পুরুষেরা নারীদের লাঞ্ছনা করেন। নারীরা যদি চয়েস করেই ওগুলো পরতো তাহলে পেটানো বা লাঞ্ছনার কথা আসতো না।

৫) বাংলাদেশে একইভাবে গণ পরিবহনে, বাজারে, মার্কেটে কোথাও বোরকাবিহীন নারীরা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারেন না। বোরকা ছাড়া বের হলে পিছন থেকে থুথু দিবেন, কেউ দিবে পানের পিক ফেলবে গায়ে, কেউ এসে বিড়বিড় করে কানের সামনে এসে বেশ্যা বলে গালি দিয়ে যাবে। যে পর্দা না করার জন্যে এসব নির্যাতনের শিকার হতে হয় তবে সেটা চয়েস হয় কী করে? এটা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া, বাধ্য করা।

৬) বাংলাদেশের গরমে শাড়ি বা সালোয়ার কামিজের উপর বোরকা হিজাব চাপিয়ে চলাফেরা করলে হিট স্ট্রোক হওয়ার আশংকা থেকেই যায়। এরপরেও অধিকাংশ নারী বোরকা পরছেন, কিন্তু কেন? তাদের আরামটা আসলে কোথায়? একটা বস্তা বন্দী পোশাক কেন নারীর চয়েস হতে যাবে? ঠিক কোন যুক্তিতে, বলতে পারেন?

 

কাজী তামান্না কেয়া,
গবেষক, এক্টিভিস্ট, লেখক
সাউথ ক্যারোলিনা, ইউএসএ,

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 4
    Shares