প্রচ্ছদ গল্প

মিলান কুন্ডেরা কি আজও প্রাসঙ্গিক?

27
মিলান কুন্ডেরা কি আজও প্রাসঙ্গিক?
পড়া যাবে: 6 মিনিটে

জনাথন কো, ভাষান্তর : মাইশা তাবাসসুম

গত বছর ফ্রান্সে মিলান কুন্ডেরার নতুন উপন্যাস যখন প্রকাশিত হলো, তখন তার বয়স ৮৫ বছর।

উপন্যাসের প্রথম লাইনেই দেখা যায় এক লোক পারস্যের রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছে, ঠিক মেঘের আড়াল থেকে সূর্য ওঠার মতো করে। লোকটির নাম অ্যালেইন। আমরা জানি না তার বয়স কত কিংবা তিনি দেখতে কেমন, কিন্তু আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, তিনি একজন বুদ্ধিজীবী। কারণ তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক নারীর অনাবৃত নাভি তার মধ্যে কামের যে ঝোঁক তৈরি করে তা প্রতিফলিত হয়েছে তার ‘বিশেষত্ব নির্ধারণ ও বর্ণনা’য়। এমন ধরনের বর্ণনা দিতে পারেন মিলান কুন্ডেরা ছাড়া আর কে? উপন্যাসের প্রথম দেড় পৃষ্ঠাতেই কুন্ডেরার প্রধান দুটি বক্রক্তি সঠিকভাবে উপস্থিত। প্রথমত, পুরুষ চরিত্রের এমন নজর যা নারীর শরীরে বিদ্ধ ও মোহিত, এবং ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে সেই নারীদেহের বিশদ সরস বর্ণনা। দ্বিতীয়ত, সেই বর্ণনায় যুগ-যুগের পুরানো নারীর সম্মোহনী শক্তির কেন্দ্রবিন্দুকে টেনে আনা। এই দুই বৈশিষ্ট্যই ঔপন্যাসিকের লক্ষ্য এবং তার সারা জীবনের কাজ, যা তিনি ব্যক্তি চেতনা, ইতিহাস এবং রাজনীতির বহমান প্রবাহের মাঝে যোগাযোগ-সূত্র গঠন করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

‘দ্য ফেস্টিভাল অফ ইনসিগনিফিকেন্স’-এ কুন্ডেরা অতুলনীয় না হলেও, টিপিকাল বটে। এটি একটি বৃদ্ধ মানুষের বই এবং এখানে যেহেতু প্রফুল্লতা ও কৌতুকপূর্ণ জ্ঞানের ঝকমকে চিহ্ন আছে, সেহেতু এখানে মর‌্যাল কিছু না থাকাটাই স্বাভাবিক। কুন্ডেরার এই উপন্যাসের ‘ফেবার’ সংস্করণের কভারের পেছনে দেখা যায় ত্রিশোর্ধ্ব সব লেখকের উদ্ধৃতি, যেমন ইয়ান মেকিউয়ান, সালমান রুশদি ও কার্লোস ফুয়েন্তেস। এরাই মনে করিয়ে দেন যে, কুন্ডেরার খ্যাতি আশির দশকে সবার শীর্ষে ছিল, যে সময়ে প্রত্যেকেই ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ ও ‘দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিং’ পড়ছিল। সেই সময়ে এই বইগুলো এত জরুরি ও অপরিহার্য কেন মনে হতো? শুধু কি এজন্যই যে, কম সময়ে সেগুলো প্রচলিত ভাবধারার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল? নাকি আদৌ শক্তি-সামর্থ্য ও স্থায়ী কিছু সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল? ইতিহাস এই উপন্যাসগুলোকে কীভাবে বিচার করবে? ন্যায়বিচার করে বললে, তার খ্যাতি নির্ভর করেছে ‘মধ্য সময়ের’ উপন্যাসগুলোতে : ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’, ‘দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিং’ ও ‘ইমমরটালিটি’।

এসবের আগে আমরা পাই পরপর তিনটি সেরিও-কমিক (গুরুগম্ভীর ও হাস্যরসাত্মক) উপন্যাস— ‘দ্য জোক’, ‘লাইফ ইজ এলস্ওয়্যার’ এবং ‘ফেয়ারওয়েল ওয়াল্টজ্’। এই উপন্যাসগুলো স্পষ্টভাবে চেকোস্লোভাকিয়ার যুদ্ধ-পরবর্তী ও কমিউনিস্ট সমাজকে ধারণ করে; এগুলো না-নিয়মমাফিক মৌলিকত্বের কোনো দাবি পণ করে, না কুন্ডেরার হলমার্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

তারপরই আমরা পাই সংক্ষিপ্ত ও হালকা ত্রয়ী উপন্যাসিকা—‘স্লোনেস’, ‘আইডেন্টিটি’ ও ‘ইগনোরেন্স’। এগুলোর শিরোনামই ঘোষণা করে এর দার্শনিক পক্ষপাতিত্ব আর ফিকশন হিসেবে এগুলোর অবস্থান।

মধ্য সময়ের বইগুলোর মধ্যে দেখা যায়, কুন্ডেরা শুধু তার মৌলিকত্বই নয়, বরং সঠিক গঠনটাও ধারণ করতে পেরেছেন। নির্বাসনে বসে লেখা এই উপন্যাসগুলোর বিষয়বস্তুও ছিল নির্বাসন। ১৯৭৫ সালে কুন্ডেরাকে তার শিক্ষক-পেশা ও কাজ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং তার উপন্যাস গণপাঠাগারে নিষিদ্ধ করা হলে তিনি চেকোস্লোভাকিয়া ত্যাগ করেন। প্যারিসে তার আগমন সাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় তৈরি করে। ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ ঐতিহ্যবাহী দীর্ঘ বর্ণনা আর উদঘাটনসমূহ এড়িয়ে গেছে, তার পরিবর্তে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত গল্পসমূহের মধ্য দিয়ে চরিত্রগুলোর মাধ্যমে একাধিক বিষয়, শব্দ ও মোটিফ তুলে ধরেছে। ব্যাপারটা এমন ছিলো যে, নিজের দেশের নোঙর টানা যেন কুন্ডেরাকে প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতা থেকে মুক্তি দিলো। তার এই উপন্যাসটিতে পাওয়া যায় এক অবিশ্বাস্য চাপল্য, নিরুদ্বেগপূর্ণ শান্তি। এখানে তিনি গল্প বর্ণনা থেকে শুরু করে নিবন্ধ রচনা করেছেন এবং আবার গল্পের বর্ণনায় ফিরে এসেছেন।

গঠন ও পরিমাণের অবিচ্ছেদ্যতা—এই একটা ব্যাপার কুন্ডেরা আমাদের শেখায়। ‘স্লোনেস’ নামক উপন্যাসিকায় পিয়ের কোদেরলো ডি ল্যাকলোর লেখা সবচেয়ে বিখ্যাত বই সম্পর্কে লিখতে গিয়ে কুন্ডেরা পর্যবেক্ষণ করেন যে, ‘লে লেসন ডেনজারসেস’ উপন্যাসের পত্রোক্ত গঠন নিছক কোনো প্রায়োগিক প্রক্রিয়া নয় যেটা সহজেই অন্য কিছু দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যাবে। এই স্টাইলটি নিজেই বাকপটু আর প্রকাশ করে যে, চরিত্রগুলো যা যা ভোগ করেছে তার সবটুকুই করেছে বলার জন্য, হস্তান্তর করার জন্য, যোগাযোগ করা, স্বীকার করা ও লেখার জন্য। এমন একটা বিশ্ব যেখানে সবকিছুই বলা লাগে, সেখানে সবচেয়ে সহজলভ্য ও মারাত্মক অস্ত্রটি হলো : উন্মোচন। এই পর্যবেক্ষণ শুধু একজন সাহিত্যিক বা ইতিহাসবেত্তা থেকে নয় বরং এমন একজনের কাছ থেকে পাওয়া যিনি নিজে গোয়েন্দা পুলিশের সুবিবেচনায় ছিলেন।

আরও পড়ুন:  রূপকথা : জোছনার কথা

‘দ্য জোক’ লেখার পর থেকে, সাহিত্য এবং সেই সাহিত্য লেখক সম্বন্ধে কী উন্মোচন করে, এ ব্যাপারটা কুন্ডেরার অন্যতম জরুরি বিষয় হয়ে পড়ে। ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ নামক বিয়ের তামিনা চরিত্রটি এক অজানা পশ্চিমা শহরে নির্বাসিতা চেক রমণী, যে কিনা তার এগারোটা নোটবুক উদ্ধার করার জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত। পশ্চিমাদের উপলব্ধির অভাবে তিনি তার কাজে বিভিন্নভাবে বাধাপ্রাপ্ত হতে থাকে—‘এখানকার মানুষকে তার জীবনের কিছু একটা বোঝাতে হলে সেটাকে অনেক সহজতর করে তুলতে হয়।’ আর এ জন্যই সে তার নোটবুকগুলোকে ‘পলিটিক্যাল ডকুমেন্টস্’ বা রাজনৈতিক কাগজপত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করতে হয়। কিন্তু আসলে সেগুলো তার স্মৃতি ঠাঁসা নোটবুক, আর এগুলো সে উদ্ধার করতে চায় কোনো রাজনৈতিক কারণে নয় বরং তার ছোটবেলার স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরার জন্য—‘সে এটাকে তার হারানো শরীর ফিরিয়ে দিতে চায়। তার মধ্যে যেই অনুরোধ কাজ করছে, সেটা সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং জীবনের জন্য।’ এই গল্প আর এর সাথে জড়িত যেগুলো আছে, সব মিলিয়ে ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ খুব সুন্দরভাবে আমাদের জীবনের সেইসব পর্যায় ধারণ করে যখন আমাদের অস্তিত্ববাদ নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টিকারী রাজনীতিকে ভেদ করে। উপন্যাসের এই বিষয়টি কুন্ডেরা যেই পরিবেশে বেড়ে উঠেছে, তার সাথে অবিচ্ছেদ্য। সোভিয়েত বামপন্থা এমন একটা টোটকা যা সত্তর-আশির দশকের পর্যবেক্ষকদের একাধারে অভিভূত এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিলো। আর এই ক্ষেত্রে কুন্ডেরার উপন্যাসগুলো এক অনন্য জানালা খুলে ধরে, এই জটিলতাগুলোকে জীবনের অপ্রতিম বিদ্রুপ, বিষাদ আর কাঠিন্যের কাছে নামিয়ে এনে একাকার করে দেয়। এটা বোঝাই যায় যে, সেই সময় তার এই উপন্যাসগুলোকে তখনকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র হিসেবে দেখা হয়েছিল।

একজন ঔপন্যাসিকের জন্য তার নিজের উপন্যাসকে অন্য কিছুর মাধ্যমে প্রকাশ করা কঠিন কাজ। ‘দ্য আর্ট অফ দ্য নভেল’ নামক সাতটি প্রবন্ধ সম্বলিত বিষয়ে কুন্ডেরা ইউরোপিয়ান নভেলার ঐতিহ্য আর এর মাঝে তার অবস্থান সম্পর্কে লিখেছেন। সেখানে তার মূল আলোচ্য বিষয় ছিল হেরমান ব্রোকের লেখা ‘দ্য স্লিপ ওয়াকার’। এটি একটি ত্রয়ী উপন্যাস, এর লেখকের সাথে তখনকার সামান্য কিছু ব্রিটিশ পাঠকের কেবল পরিচিতি ছিল। বর্তমান সময়ে এই উপন্যাস খুবই কম পড়া হয়, এমনই এই দেশে এখন আর এর একটি প্রিন্টও বিক্রি হয় না। তার এই বইগুলো তে ব্রোক বিভিন্ন রীতির সমন্বয়ের প্রয়াস চালিয়েছেন; কিন্তু কুন্ডেরার মতে উপাদানগুলো (চরণ, আখ্যান, বাণী, তথ্য, কাহিনি, নিবন্ধসমূহ) একটা সত্যিকারের পলিফোনিক মিশ্রণের বেশি পাশাপাশি সাজানো হয়েছে। এর জন্যই কুন্ডেরার নির্বাসন-পরবর্তি উপন্যাসগুলোর দিকে না তাকালেই না, যেগুলো মূলত ব্রোকের শুরু করা

ধাঁচটাকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়, এবং এই ক্ষেত্রে কুন্ডেরা বিজয়ীও বটে। কুন্ডেরা কি জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনোজাগতিক সত্যের খরচে এটা উপার্জন করেছিলেন? ‘আমার উপন্যাসগুলো মনস্তাত্ত্বিক নয়’, এই কথা এটা তিনি ‘দ্য আর্ট অফ দ্যা নভেল’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, আরও বলেছেন, ‘সঠিকভাবে বললে—এগুলো সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের নান্দনিকতার বাইরে অবস্থান করে।’ এটি নিজের লেখা সম্পর্কে করা একটি সাহসী নেতিবাচক বিবৃতি, যা আসলে তার উপন্যাসের সঙ্গে যায় না। তবে তার উপন্যাসগুলো আসলে কোন শ্রেণিতে পড়ে, এই প্রশ্নের তিনি স্পষ্ট জবাব দেননি—‘সর্ব যুগের সব উপন্যাসই তার নিজস্ব ধাঁধার সঙ্গে সম্পর্কিত….আমি যদি নিজেকে তথাকথিত মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস থেকে আলাদা করে ধরি, তার মানে এই নয় যে আমি আমার চরিত্রগুলোকে একটি অভ্যন্তরীণ জীবন থেকে আলাদা করতে চাই। বরং এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, এখানে অন্য কোনো ধাঁধা আছে, অন্য কোনো প্রশ্ন আছে, যা উপন্যাসগুলো প্রাথমিকভাবে অনুধাবন করে…আমার উপন্যাসে নিজেকে টের পাওয়ার অর্থ হলো এর অস্তিত্ব-সম্বন্ধীয় সমস্যাগুলোর সারমর্ম উপলব্ধি করা, এর অস্তিত্ব-সম্বন্ধীয় নিয়মাবলী উপলব্ধি করা।’

তার ব্যাখ্যায় এই ‘অস্তিত্ব-সম্বন্ধীয় নিয়মাবলী’ হয়তো একটা কি-ওয়ার্ডে। ‘দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিং’ উপন্যাসের চরিত্র তেরেজার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-ওয়ার্ড তাহলে হতে পারে—‘শরীর, আত্মা, মাথা ঝিমঝিম, দুর্বলতা, কাব্য ও স্বর্গ।’ এই উপন্যাসের দার্শনিক প্রতিভায় বিমোহিত হয়ে কুন্ডেরার প্রশংসাকারীরা ‘অস্তিত্ব-সম্বন্ধীয় নিয়মাবলী’কে চরিত্র অঙ্কিত করার কাজে ব্যবহার করায় খুশিই হয়েছিল। আরও বিশেষভাবে বিশেষভাবে সমালোচনা করলে বলতে হয় যে, তারা চরিত্র গঠনের এই দুর্বলতাকে ক্ষমা করে দিয়েছিল। কিন্তু চরিত্র আসলে কোনো ধারণার চেয়েও বেশি অবস্থান করে স্মৃতিতে। কয়েক বছর আগে জন বনভিল তার পত্রিকায় ‘দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিং’ উপন্যাস প্রকাশিত হবার দুই দশক পরে এর পুন-মূল্যায়ন করে একটি মজাদার প্রবন্ধ লেখেন। তার লেখার ধরন প্রশংসনীয় মনে হলেও, আসলে ছিল সন্দেহপ্রবণ—‘আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম এই ভেবে যে, আমার স্মৃতি তেমন কিছুই ধরে রাখেনি। বইটির শিরোনামের মতোই আমার মস্তিষ্ক থেকে বইটি একটি বেলুনের মতো উড়ে চলে গিয়েছে।…চরিত্রগুলোর কিছুই আমার মনে নেই, এমনকি নামগুলোও না।’ উপন্যাসটির এখনও কিছু রাজনৈতিক তাৎপর্যের কথা বিবেচনা করে তিনি আরও যুক্ত করেন, ‘প্রাসঙ্গিকতা আসলে জীবনোপলব্ধির তুলনায় কিছুই নয়, যার মাধ্যমে সত্যিকারের ঔপন্যাসিকরা যোগাযোগ স্থাপন করেন।’

আরও পড়ুন:  কাচের চুড়ি

কুন্ডেরার নিজের লেখা থেকে মনে হয় যে, তিনি নিজেকে বনভিলের ইঙ্গিত করা ‘সত্যিকারের মহৎ লেখক’-এর অন্তর্ভুক্ত মনে করেন না। তার প্রিয় ঔপন্যাসিকগণ, স্টার্ন, ডিডের, ব্রক, মিউসিল, গমব্রোয়িচ—এদের মধ্যে অনেকেই সেই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল যাদের লেখা বিদ্রুপাত্মক ও সন্দেহজনক; এসব লেখকরা তাদের অসঙ্গতি, ফাঁদ, কৌশল সম্বন্ধে এতই সচেতন যে, এক পর্যায়ে তাদের লেখা প্যারোডি কিংবা আত্ম-জিজ্ঞাসাবাদে পরিণত হয়ে যায়। এই নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কীকরণের জন্য কুন্ডেরার অবস্থান নিরাপদ : বনভিলের লেখায় কোথাও জীবনোপলব্ধির অনুপস্থিতি নেই, কিন্তু কুন্ডেরার লেখায় নারী চরিত্রের বর্ণনা অস্বস্তিকরভাবে অনুপস্থিত।

কুন্ডেরার বিরুদ্ধে নারী চরিত্র বিষয়ক বেশ কিছু কেস আছে। জোয়ান স্মিথের ‘মিসোজিনিস’ বইয়ে খুব সুন্দরভাবে এ বিষয়ে বলা হয়েছে—‘কুন্ডেরার লেখায় নারীদের প্রতি বৈরিভাব একটি সাধারণ বিষয়।’ উদাহরণ স্বরূপ তিনি কিছু রচনাংশও উল্লেখ করেছেন, ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ থেকে এমন অস্বস্তিকর অংশ তুলে ধরেছেন যেখানে, একজন নারী ম্যাগাজিন-সম্পাদক, পুরুষ বর্ণনাকারীর কাছ থেকে আর্টিকেল সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপদে পড়ে যান। সেই বর্ণনাকারী তাকে তার গোপন ফ্ল্যাটে এসে দেখা করতে বলেন। সেই নারীর সাথে দেখা করার সময় তার যেই প্রতিক্রিয়া হয় তা এমন, ‘…তাকে ধর্ষণ করার এক পাশবিক বাসনা হয় আমার। তার মল ও আত্মা সহকারে তাকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করার ইচ্ছা হয় আমার।’ (নিঃসন্দেহে এটি একটি ভয়ানক রচনাংশ। কিন্তু আমার কাছে এটিকে এক প্রকার পুরুষের নিন্দা বলেই মনে হয়েছে।) কুন্ডেরার প্রাণনাশক উদাহরণগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের নারী চরিত্রের সংখ্যার কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে কুন্ডেরার পরবর্তী সাহিত্যগুলোতে নারী পুরুষ উভয়কেই একইভাবে উপলব্ধি করা হয়েছে। তার সাম্প্রতিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘ইগনোরেন্স’ কিছু দিক থেকে আমার পছন্দের, অবশ্যই এর নায়িকা ইরেনার জন্য নয়। ইরেনা একটি জটিল ও সহানুভূতিশীল চরিত্র, উপন্যাসে নির্বাসনের ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী আচরণকে বুদ্ধি আর সমবেদনায় মুড়িয়ে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এখানেও শেষ পর্যন্ত তাকে ঈক্ষণকামী হিসেবে তুলে ধরা হয়, যেখানে সে নগ্ন অবস্থায় ‘দুই পা অযত্নে ছড়িয়ে’ শুয়ে থাকে আর তার প্রেমিক ‘বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ তার বিষণ্ণ উরুসন্ধির দিকে চেয়ে থাকে।’ কেন কুন্ডেরা তার নারী চরিত্রগুলোকে এমন ব্যাপ্তি, এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে বর্ণনা করতে পছন্দ করেন? আর কেনই বা তিনি ইউরোপিয়ান উপন্যাসের উপর একটি ১৫০ পৃষ্ঠার বই লিখে ফেলেন, আগাথা ক্রিস্টি ব্যতীত আর একজনও লেখিকার নাম উল্লেখ না করে?

আমার এটা দৃঢ় বিশ্বাস যে, কুন্ডেরার এই দীর্ঘ খ্যাতি পতনসাধন যদি হয়, তাহলে সেটা তার লেখায় জীবনোপলব্ধির অভাবে হবে না, এবং এর জন্যও হবে না যে তার লেখা একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গণ্ডি সম্পর্কিত, যা এক সময় বিস্মৃত হয়ে যাবে। বরং তার পতনসাধন হবে তার প্রবল পুরুষকেন্দ্রিকতার জন্য। আমি ‘নারীবিদ্বেষী’ শব্দটা এড়িয়ে গেলাম, কারণ আমার মনে হয়নি যে তিনি নারীদের ঘৃণা করেন বা ধারাবাহিকভাবে নারীর বিরোধীতা করেন। কিন্তু তিনি পৃথিবীটাকে প্রবলভাবে পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, এবং এটিই তার ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে অসীম অর্জনকে সীমিত করে দিয়েছে। ভাগ্যক্রমে ‘দ্য ফেস্টাভাল অফ ইনসিগনিফিকেন্স’ এরূপ পুরুষকেন্দ্রিক প্রবণতা দ্বারা খুব কম বিকৃত হয়েছে, অন্যান্য সাহিত্যের তুলনায়। আর এর জন্যই এটি তার শিল্পসম্ভারের সারগর্ভ না হলেও, তাদের জন্য একটি ভালো পুনঃপ্রবেশ হতে পারে, যারা তার বিখ্যাত বইগুলোর অনিশ্চিত যৌন-রাজনীতি পড়ে দমে গিয়েছিল।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 5
    Shares