প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত

অনার কিলিং: নারীর কি সঙ্গী চয়েজ করার অধিকার নেই?

10
Women Chapter
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

কাজী তামান্না কেয়া:

মেয়ে প্রেম করে বা প্রেম করে বিয়ে করেছে? ও মাগো! আপনার পরিবারের সম্মান বলে কিছু রইলো না যে! সব ধূলায় মিশে গেল। এখন সম্মান উদ্ধার করতে প্রেম করা মেয়েটিকে হত্যা করতে হবে। তো, হত্যাটা কে করবে? হত্যা করবে মেয়ের বাপ, চাচা, মামা, বড় ভাই… মোট কথা মেয়ের পুরুষ আত্মীয়। ‘পাপিষ্ঠা’ মেয়েকে হত্যা করে পরিবারের সম্মান উদ্ধার করার এই ঘৃণ্য ঘটনাই অনার কিলিং নামে পরিচিত। কারণ

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এবং পাকিস্তান, ভারত ও আফগানিস্তানেই মূলত অনার কিলিংয়ের সর্বোচ্চ ঘটনা ঘটে।  প্রতি বছর হাজারও নারীকে খুন করা হয় পরিবারের সম্মান ফিরিয়ে আনতে।  জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর পাঁচ হাজার মেয়ে এভাবে খুন হচ্ছে এবং মোট অনার কিলিং এর ২০ ভাগ শুধু পাকিস্তানেই ঘটে। কারণগুলো মোটামুটি কাছাকাছিই সবক্ষেত্রে। যেমন পারিবারিকভাবে বিয়েতে অসম্মতি জানানো, তালাক বা সেপারেশন চাওয়া, বিয়ের বাইরে কারও সাথে যৌন সম্পর্ক হলে মেয়েটির পরিবারের তথাকথিত ‘সম্মানহানি’ ঘটে, আর তা উদ্ধার করা হয় মেয়েটিকে হত্যার মাধ্যমে।

মূলত নিজের জীবনের ওপর মেয়েটির কোন অধিকার নেই, চয়েজ তো দূরঅস্ত। তো, এই যে মেয়েদের ‘চয়েজ’ বলে গলা ফাটায় একশ্রেণির লোকজন, তারা কেন মেয়েদের নিজের জীবন বেছে নেবার এই অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে? এবং এরকম নৃশংস উপায়ে?

একটি জরিপে বলা হয়েছে, এই শতকে এসে নারীর অধিকতর স্বাধীনতাকামী হয়ে উঠাই অনার কিলিংয়ের অন্যতম নিয়ামক হয়ে উঠেছে। প্রাণে বাঁচতে মেয়েরা অন্য দেশে পালিয়ে গিয়েও শেষরক্ষা করতে পারছে না। পরিবারের লোকজন সেখানেও তাকে ধাওয়া করছে এবং ধরতে পারলে সরাসরি হত্যা করছে। লাতিন আমেরিকাও এদিক দিয়ে পিছিয়ে নেই। মূলত নারীর জন্য নিরাপদ দেশ, নিরাপদ আবাসন কোথাও নেই।

দেখা গেছে, ১৭, ২৩ এবং ৩৬ বছর, এই বয়সগুলোতে মেয়েরা সবচেয়ে বেশি অনার কিলিং এর শিকার হচ্ছে। মুসলিম দেশগুলোতে যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে তখন এ নিয়ে উচ্চবাচ্য হয় কম, পশ্চিমা দেশগুলোতে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে অনার কিলিং না বলে পশ্চিমা স্টাইলে  ‘নারী হত্যা’ বলা হয়ে থাকে। তখনই ঘটনাগুলোর মোড় ঘুরে যায়, আর পিছনের সত্যি ঘটনাটাও আড়ালে থেকে যায়।

আরও পড়ুন:  শিক্ষকের গলায় নোবেল পদক পরিয়ে দিয়ে বললেন, এ পুরস্কার আপনার

পত্রিকা মারফত জানা দুটো ঘটনা বলি।

পাকিস্তানে এক মেয়ে ছাদে উঠে বৃষ্টিতে ভিজেছিল। সেই দৃশ্য কেউ সম্ভবত ক্যামেরায় ধারণ করেছিল। তাতে মেয়ের বড় ভাই ক্ষিপ্ত হয়ে বোনকে খুন করে বসে। ছাদে বৃষ্টিতে গোসল করায় পরিবারের বিরাট সম্মান হানী হয়েছে, সুতরাং বোনকে খুন করাই একমাত্র সমাধান!! আরেক বাবা পালিয়ে বিয়ে করার অপরাধে মেয়েকে মেরে ফেলার প্ল্যান করে। সমাজের সবার সামনে পুনরায় অনুষ্ঠান করে বিয়ে দেবে বলে মেয়েকে বাড়ি ফিরে আসতে বলে। মেয়ে বাবার কথা বিশ্বাস করে বাড়ি আসে। এরপর বাপ ভাই মিলে তাকে বস্তায় ভরে বাড়ির পাশের নদীতে ফেলে দেয়। মেয়েটি বস্তার ভেতর থেকে ধস্তাধস্তি করে বের হয়ে কোন রকম পাড়ে উঠে আসে এবং এক দৌড়ে সোজা থানায় যায় অভিযোগ করতে। কয়েকদিন পর শুনানির তারিখ পড়ে। শুনানীর দিন বাপ তাকে আদালত প্রাঙ্গনে গুলি করে হত্যা করে। এই সব খুনের কোন বিচার হয় না। পাকিস্তানে বিদ্যমান শরীয়া আইনে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। মেয়েদের উপর ঘটে যাওয়া কত বর্বরতার ঘটনাইতো ভুলে যাই, কিন্তু এই দুটি ঘটনা আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে পারিবারিক সহিংসতার বীভৎস সাক্ষী হয়ে।

দুর্ভাগ্যের বিষয় অনার কিলিং বিষয়টা এখন বাংলাদেশেও ঘটতে শুরু করেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৬ বছরের কিশোরীকে তার মামা পাশের ক্ষেতে এক ছেলের সাথে দেখতে পায়। এরপর মেয়ের বাবাকে জানালে তারা মেয়েটিকে হত্যার পরিকল্পনা করে। বাপ, মামা এবং বড়ভাই মিলে মেয়েটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পাশের ডোবায় লাশ ডুবিয়ে রাখে। পরে মা বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করে।

প্রশ্ন হলো মেয়েটি কি সত্যি পাশের ক্ষেতে তার প্রেমিক বা বন্ধুকে নিয়ে গিয়েছিল? আর গেলেই বা তাকে মেরে ফেলতে হবে কেন? ঘটনাটা মামা দেখেছে। যদি মামা মিথ্যে বলে থাকে? যৌন নির্যাতনের শিকার মেয়েরা প্রথম কোথায় হয় জানেন? পরিবারের সদস্যদের হাতে এই যেমন মামা, কাকা, বোনের জামাই, খালু, ফুপা বা অন্য সদস্য যারা সরাসরি মেয়েটির সাথে বাড়িতেই নির্যাতনটি করার সুযোগ পায় এবং তার সদব্যবহার করে। সব পুরুষ আত্মীয় খারাপ নয়, যৌন নির্যাতিনকারী বা ধর্ষক নয়। কিন্তু যারা খারাপ, তাদের দ্বারা সংঘটিত নির্যাতনের ক্ষত মেয়েটিকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। পারিবারিক এইসব অপরাধের বিচার সুষ্ঠুভাবে হচ্ছিল না। সেই সুযোগে অপরাধ বাড়তে বাড়তে এখন হত্যায় মোড় নিচ্ছে। বাপ, ভাই, কাকা মিলে মেয়েটিকে মেরে ফেলতে শুরু করছে। আহা, জীবন!

আরও পড়ুন:  ১ আগস্ট: ‘বাংলাদেশ’ নামটি যেদিন জোরেশোরে উচ্চারিত হয়েছিল বিশ্বের বুকে

ওপরের ছবিতে যেই নারীদের দেখছেন– এদের প্রত্যেককে হত্যা করা হয়েছে পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে।

শুধু কি মেয়েটিকে হত্যা করা হয়? বহু ক্ষেত্রে প্রেমিক বা মেয়ের স্বামীটিকেও হত্যা করা হয় মেয়েটির সাথে প্রেম করার বা প্রেম করে বিয়ে করার অপরাধে। অনার কিলিং কি শুধু আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেই হয়? না। এইসব পাষণ্ড বাপ, ভাইরা লন্ডন বা এমেরিকার মত সভ্য সমাজে বসবাস করলেও অপরাধ করা থেকে বিরত থাকতে পারে না। নির্দ্বিধায় মেয়েকে খুন করে ফেলে বিদেশের মাটিতে বসেই। ব্রিটিশ সরকারের কাছে মুসলিম পরিবারগুলোতে সংঘটিত এইসব কিলিং এক বিরাট সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই।

তবে কেবল মুসলিম পরিবারেই বিষয়টি আর সীমাবদ্ধ নেই। ভারতে কিছুদিন আগেই একটি হিন্দু মেয়ে স্বেচ্ছায় একটি মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করায় মেয়েটির পরিবার দুজনকেই পুড়িয়ে হত্যা করেছে। গবেষকরা বলছেন, কেবল ধর্মের মধ্যেও আটকে নেই ভয়াবহ, নৃশংস এই ঘটনা, বরং উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কোনো কোনো অঞ্চলে।

পারিবারিক সম্মান প্রেমে নষ্ট হয় না, খুনে নষ্ট হয়, এই কথাটি খুনি পিতারা কবে বুঝবেন জানি না। তবে বাংলাদেশে এই সমস্যাটি আরো বড় হিসেবে দেখা দেওয়ার আগেই সমাধান করা হোক।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 4
    Shares