প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত

নিরাপত্তার নামে মোড়কে বাঁধানো নারী

9
Women Chapter
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

নাছিমা মুন্নী:

নোয়াখালী শহরটি এক রাস্তার শহর। এ শহরের কত আজব আজব ঘটনা ঘটে কেউ কিছুই বলে না। দেখেও না দেখার ভান করে। হয়তো কোনো কাজে শহরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি একজন বয়স্ক লোক হ্যান্ড মাইক দিয়ে নারীদের ইসলামিক নানা উপদেশ দিচ্ছে। উপদেশ বললে ভুল হবে, মনে হচ্ছে তিনি নারীরা কেন ঘর থেকে বের হয়েছে, সেজন্যই শাসন করছেন। তিনি বলে যাচ্ছেন- তোমরা পর্দা করো না কেন? তোমরা ঘর থেকে বের হয়েছো কেন, তোমাদের ঘরে কি পুরুষ নাই। হিজাব, বোরকা ছাড়া বের হয় বেপর্দা নারীরা। সব ধ্বংস হয়ে যাবে। সব ধ্বংস করে দিবে বেপর্দা নারীরা । আরো নানা বাজে, বিশ্রী মন্তব্য তিনি বলে যাচ্ছেন আর দোকানদার, ক্রেতা, পথচারীরা তার কথা শুনে যাচ্ছে।
শহরে এতগুলো দোকানপাটের সামনে দিয়ে হেঁটে হেঁটে এসব বিশ্রী মন্তব্য করে যাচ্ছে, কেউ তাকে কিছু বলছে না। সবাই তো শুনছে। লোকটাকে দেখলে কোনো কোনো নারীকে দ্রুত চলে যেতে দেখেছি। লুকিয়ে যেতে দেখেছি। বিরক্ত হতে দেখেছি। শহরের বিভিন্ন মিটিংয়ে লোকটার কথা তুলেছি। কখনো কি কোনো পুরুষ এগিয়ে এসেছিল তার মাইক বন্ধ করার জন্য? দেখিনি।

বাচ্চাকে স্কুলে পৌছে দিয়ে ফেরার পথে কিছু গার্ডিয়ানসহ হেঁটে বাসায় চলে আসি প্রতিদিন। আসার পথে কম করে হলেও দশদিন পাঞ্জাবি পরা দাঁড়িওয়ালা একলোক সাইকেল করে যাওয়ার পথে আমাকে উদ্দেশ্যে করে বলছে, মাথায় কাপড় দেন। লোকটাকে কিছু বলার আগেই লোকটা লাপাত্তা। আমি যাদের সাথে হেঁটে বাসায় ফিরছি তারা সকলেই বোরকা , হিজাব পরিহিত। তাদেরই কেউ একজন সাইকেল আরোহীর মন্তব্যের সাথে সুর মিলিয়ে হয়তো বলছেন, আপনি তো ফুল হাতার জামা পরেন, সুন্দর করে ওড়নাও পরেন, শুধু হিজাবটা পরে ফেললে একদম পরিপূর্ণ।

নোয়াখালী শহরে নারী দিবস, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস, রোকেয়া দিবস খুব আয়োজন করে উদযাপন করা হয়। গ্রামের নারী, শহরের নারীদের উপস্থিতিতে জমজমাট আলোচনা সভার আয়োজন হয়। কিন্তু আপনি যেদিকে তাকাবেন শুধু বোরকা আর হিজাবে মোড়ানো সব নারী। গরমে হাঁসফাঁস করছে। কিন্তু মুখের আবরণ থেকে তবুও হিজাব খুলছে না। সমাবেশের নারীদের দেখলে মনে হয় এটা বাংলাদেশ নয়, সৌদি আরব, আফগানিস্তান বা পাকিস্তান।

আরও পড়ুন:  ঐতিহ্য নয়, অসমতার পরিবর্তন চাই

একটা বিষয় খেয়াল করে দেখেছি, আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিয়েতে লাগেজে শাড়ি, গহনা সব ধরনের উপকরণের সাথে বোরকা, হিজাব সংযুক্ত করে দেয়া হয়। ছেলেপক্ষ বিয়ের পর কনের বোরকা পরার বিষয়টি কনর্ফাম করে নেয়। বিয়ের পর বেশিরভাগ মেয়ের বোরকা পরা বাধ্যবাধকতা হয়ে যায়। কেন হয় ? কেন মেনে নেয়? মেনে না নিলে কি বিয়ে হবে না। হতো না। নিশ্চয়ই হতো। মেনে না নিলেও বিয়েটা হতো। একটু মেরুদণ্ডটা সোজা করে দাঁড়ান। তখন আর চাপিয়ে দিবে না।

কোনো নারীর স্বামী প্রবাসী হলে তো কথাই নাই। তাকে বাধ্যতামূলক বোরকা পরতে হয়। অনেককে বলতে শুনেছি, তুমি কারে দেখানোর জন্য সাজবা? যারে সেজে দেখাবা, সে তো বিদেশে থাকে। আর স্বামী মরে গেলে তো স্বামীর কফিনের সাথে তার স্বাধীনতা, সাধ, আহ্লাদ সবশেষ হয়ে যায়। সে নারী যে জীবন্ত লাশ। তার স্বামী নেই এটা মাথায় রেখে সব রঙিন পোশাক বাদ দিয়ে বোরকা হিজাবে মোড়াতে হয়। রুবিকে বলতে শুনেছি, তার স্বামীর মৃত্যুর পর কখনো সে শাড়ি পরেননি। সাদামাটা বোরকাই তার একমাত্র পোশাক।

মেয়ে শিশু একটু বড় হতেই বোরকা পরতে দেওয়া হয়। তাকে বোঝানো হয় এটা তার নিরাপত্তার জন্য করা হয়েছে। বোরকা সে আদৌ স্বচ্ছন্দ্যবোধ করে কিনা না জেনেই চাপিয়ে দেয়া হয়। এরই ফলশ্রুতিতে দেখা যায় সে বোরকা পারিবারিক চাপে পরিধান করলেও কিছু কিছু জায়গায় গিয়ে বোরকা খুলে প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়। যা অভিভাবকদের অগোচরে।

আমরা দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় মিছিলের প্রথম সারির কোনো নারী হিজাব বা বোরকা পরেনি। বোরকার প্রচলন, হিজাব পরার প্রবণতা ইদানিং যেন বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে বেড়ে গেছে। রাস্তায়, অফিস-আদালতে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে হিজাব পরা নারীর সংখ্যাই যেন বেশি বলে মনে হয়।

আরও পড়ুন:  পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং নারী জীবনের বাস্তবতা

শাড়ি বা কামিজ পরে গ্রামের মেয়েরা পুকুরে সাঁতার কাটতে দেখা যায়। এটা বাংলাদেশের চিরাচরিত/স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে হিজাব পরে সুইমিং পুলে সাঁতার কাটা এবং সে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা, বিষয়টি কী দাঁড়াচ্ছে? এটা কী ধরনের পাগলামি? বাচ্চাকে সুইমিং পুলে মা সাঁতার শেখাচ্ছে হিজাব পরে। বাবা সে ছবি তুলে ফেসবুকে দিচ্ছে।

কীভাবে এই পর্দা প্রথা এলো, একটু পেছনে ফিরে তাকাই । বর্বর যুগের তখন শেষ প্রায়। এই যুগে বহু পত্নী এবং বহু পতীর ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। উল্লেখযোগ্য যে বহুপত্নীর মধ্যেও একজন প্রধান স্ত্রী থাকতো। এরপর থেকেই পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যেই একজন বিশেষ নারী ও পুরুষকে পাবার ও নিজেদের মধ্যে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ্রহ দেখা গেল। মেয়েরা নিজেদের ওপর পুরুষের দলগত যথেচ্ছ পীড়নের হাত থেকে মুক্তি পাবার আকাঙ্ক্ষায়, একগামিতায় নিরাপত্তা বাড়বে এই বিশ্বাসে একজন পুরুষের স্ত্রী হিসেবে সম্পর্ক গড়ার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছিল।

এরপর একজন বিশেষ নারী হলো একজন বিশেষ পুরুষের স্ত্রী। তার সন্তানই হলো সেই নারীর গর্ভজাত সন্তান। পিতৃত্বের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য নারী প্রায় আধা কয়েদি হলো। সেই সঙ্গে তার সতীত্ব রক্ষার তোড়জোরও শুরু হলো। তখন অন্য পুরুষের দৃষ্টি থেকে আড়ালে রাখার জন্য , অন্যের সংস্পর্শে যেন না যেতে পারে সেজন্য ঘরের নির্দিষ্ট গণ্ডিতে নারীকে প্রায় আটক রাখা হতো। নারীর মুখমণ্ডল, শরীর সবকিছু ঢেকে রাখা হতো। এভাবেই পর্দা প্রথা, ঘোমটা ও বোরকার প্রচলন শুরু হয়। এ সময় থেকেই নারীর দাসত্ব পাকাপোক্তভাবে স্বীকৃত হয়ে গেল।

নাছিমা মুন্নী
উন্নয়নকর্মী

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 5
    Shares