প্রচ্ছদ এডিটরস পিক

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি

10
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি
পড়া যাবে: 4 মিনিটে

ডা. এস এ মালেক

শেখ হাসিনা সম্পর্কে লিখতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা, এটাই তার বড় পরিচয়। তিনি কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবেননি যে, তার মহান পিতা ২৪ বছরের সংগ্রাম ও ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম দিলেন আর তারই স্বাধীন করা দেশে মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ শাসনের সুযোগ পেলেন। যে অকল্পনীয়, মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনায় তার মহান পিতা পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ তিনি হারালেন, তাও ছিল কল্পনার বাইরে। সৌভাগ্যক্রমে দেশের বাইরে অবস্থান করায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। হয়তো মহান আলস্নাহর রহমত ছিল তার ওপর। বিশেষ করে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাকে সেদিন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন আলস্নাহ। স্কুলজীবন থেকেই তার রাজনৈতিকচর্চা শুরু। কলেজজীবনে ছাত্র সংসদ নেত্রী ও বিশ্ব বিদ্যালয়েও সক্রিয় রাজনৈতিককর্মী। প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে তার বিবাহ হয়। সেই সূত্রে ‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট তিনি দেশের বাইরে পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন। প্রায় ৬ বছর দেশের বাইরে অবস্থানকালে ১৯৮১ সালে তার অনুপস্থিতিতে দলের এক বিশেষ অধিবেশনের মাধ্যমে সর্বসম্মতভাবে কাউন্সিলরদের সমর্থনে দলীয় প্রধান নির্বাচিত হওয়ার পর ওই বছরের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরে আসেন। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সেদিনের প্রত্যাবর্তনের দৃশ্য যারা অবলোকন করেছিলেন, তাদের অবশ্যই মনে আছে লাখ লাখ জনতা, কর্মী, সমর্থক তাকে কীভাবে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। মুষলধারে বৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করে প্রায় ২০ লাখ মানুষ নতুন বিমানবন্দর থেকে ঢাকা পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেন এই প্রাণঢালা অভ্যর্থনা। মনে হয় মানুষ যেন বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পেল। ৭৫-এর ১৫ আগস্টের ভয়াবহ রাতের পর থেকে সুদীর্ঘ সময় মানুষ যেন অপেক্ষমাণ ছিল এমন এক নেত্রীর জন্য যিনি তার পিতার মতো দেশের মানুষের জন্য জীবন বিলিয়ে দেবেন। বাস্তবে কিন্তু তার প্রতিফলন ঘটছে। পিতার আদর্শে গড়া রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আর তার হত্যার পর সেই দল যে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল, বাংলার মানুষ তা হাড়ে হাড়ে টের পায়। সঠিক নেতৃত্বের শূন্যতায় যে অন্যতম কারণ এটাও মানুষের বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি। (৭৫-৮১) এই ৬ বছর খোন্দকার মোশতাক, সায়েম ও জিয়ার নেতৃত্বে দেশ যেভাবে স্বাধীনতার শত্রম্নদের দিয়ে পরিচালিত হয়েছে একের পর এক অভু্যত্থান-ষড়যন্ত্র ও তথাকথিত বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করা হয়েছে, বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে, রাষ্ট্রীয় ৪ নীতির অবলুপ্তি ঘটিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংবিধানকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া হয়। ঠিক পাকিস্তানি ধারায় দেশকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এ সব কিছুর প্রতিরোধে স্বাধীনতার পক্ষের বৃহত্তম দল তেমন কিছু করতে সক্ষম হয়নি বরং স্বৈরশাসক জিয়ার সঙ্গে গেপান আঁতাত করে অস্তিত্ব ও নেতৃত্ব রক্ষায় অপচেষ্টা চালিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতার কোন্দলে প্রায় দ্বিধা-বিভক্তির জালে আবর্তিত ছিল। এমন এক ক্রান্তিকালে এবং দেশ ও জাতির চরম দুঃসময়ে বাংলার নির্যাতিত, নিপীড়িত মুক্তিপাগল মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষ অধিবেশনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে তার পিতার স্থানে বরণ করে নেয়। সেই থেকে নতুন পথে শেখ হাসিনার যাত্রা শুরু।

আরও পড়ুন:  করোনাকাল ও শিক্ষার্থীদের অটোপ্রমোশন

তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে জিয়া ও তার অবৈধ সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো, দেশরক্ষায় আন্দোলনে নামতে হলো শেখ হাসিনাকে। জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিসহ মৌলিক অনেক দাবি নিয়ে শেখ হাসিনা রাজপথে অবস্থান নিলেন। তৎকালিন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে বেশকিছু দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় সরকার। আকস্মিক জিয়া নিহত হন তার সেনা সদস্যদের দ্বারা। কিন্তু স্বৈরশাসনের অবসান হলো না। কিছু দিনের মধ্যে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করে একই ধারায় দেশ শাসন শুরু করলেন। তবে জেনারেল এরশাদ জিয়ার আমলের মতো নৃশংস হত্যাকান্ড চালায়নি। শেখ হাসিনার আন্দোলনের ফলে তাকে নির্বাচন দিতে হয়েছে। সেই নির্বাচন প্রভাবিত করে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু আন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসক এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। তারপর অনুষ্ঠিত হয়েছে এক ষড়যন্ত্রমুখী নির্বাচন। বিরোধী দলের আন্দোলনে পরাজিত হলেও এরশাদ বিএনপির সঙ্গে গোপন আঁতাত করে যেন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়। সেই নির্বাচনে শেখ হাসিনার বিজয়ী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। শুধু প্রশাসনিক ষড়যন্ত্রের কারণে পরাজিত হতে হয়েছিল ও বেগম জিয়া ক্ষমতাসীন হন। ৩ দলীয় জোটের সব শর্তকে উপেক্ষা করে তিনি স্বৈরশাসকের মতো ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করতে থাকেন, চেয়েছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রভাবিত করে ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করতে। কিন্তু গণ-আন্দোলনের মুখে তাকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। ৭৫-এর প্রতিবিপস্নবের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় আবার দেশ পরিচালনা। বিসর্জিত মূল্যবোধগুলো একে একে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। জয় বাংলা স্স্নোগানে আবার মুখরিত হয়েছে বাংলার আকাশ-বাতাস। সাম্প্রদায়িকতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেকু্যলার রাজনীতি। সরকার পরিচালনার ধারায় পরিবর্তন এনে মুক্তিযুদ্ধের ধারা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে দেশ ও জাতিকে দ্রম্নত উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে নেওয়ার জন্য যা কিছু প্রয়োজন জননেত্রী শেখ হাসিনা একে একে সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। প্রথম ৫ বছর অর্থাৎ ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদ অতিবাহিত হয়েছে দেশকে সঠিক ধারায় আনয়ন ও অগ্রগতির সঙ্গে পরিচালিত করতে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুসভাবে বিজয়ী হয়ে তিনি তার পিতার সোনার বাংলা বিনির্মাণে আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমেই দৃষ্টি দেন কৃষির ওপর। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশ কৃষক শ্রেণিকে অর্থনৈতিকভাবে সফল করতে না পারলে যে জাতির অর্থনৈতিক মেরুদন্ড শক্তিশালী হয় না; এটা বুঝতে পেরেই তিনি কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে চাষাবাদের আওতায় এনে এবং কৃষকদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদান ও চাষাবাদের উপকরণ সহজলভ্য করার মাধ্যমে যে যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করেন এর ফলে দেশ দ্রম্নত খাদ্য স্বনির্ভরতা অর্জন করে। খাদ্য ঘাটতির দেশ পরিণত হয় খাদ্য উদ্বৃত্তর দেশে। দেশের খাদ্য চাহিদা ৩ কোটি ৫৫ লাখ টন। এবার উৎপাদন হয়েছে প্রায় পৌনে ৪ কোটি টন। প্রায় ২০ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত। এটা সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বের কারণে। এ বছর একসঙ্গে ৩টা দুর্যোগ। মহামারি করোনা, ঘূর্ণিঝড় ও সুদীর্ঘ সময় বন্যা। লাখ লাখ টন খাবার বিনামূল্যে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে সরবরাহ করা হয়েছে। অনুদান দেওয়া হয়েছে দুর্বল শ্রেণিকে।

আরও পড়ুন:  এখন টিকে থাকাই কঠিন

প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা খাতে। করোনার ভয়াবহ প্রকোপ যেভাবে শেখ হাসিনা সরকার মোকাবিলায় উদ্যোগী হয়েছে তার প্রশংসা করেছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা।

এত বড় ত্রিমুখী মহাদুর্যোগের পর দেশের অর্থনীতিতে আবার অগ্রসরমান করতে সক্ষম হওয়া খুব সহজ ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর দক্ষতা ও দূরদৃষ্টির কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। এ মহাদুর্যোগের পূর্বকালীন বাংলাদেশের বাস্তবতা কি ছিল। জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশে উন্নীত, বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় ২০৬৪ মার্কিং ডলার, মুদ্রাস্ফীতি ৫%, নতুন বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে ৩৫ কোটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া, বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০,০০০ মেগাওয়াট, মিষ্টি পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, শাকসবজি উৎপাদনে চতুর্থ, পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থানে, পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে হাতে নেয়া, শিল্প-বিপস্নব ঘটানোর লক্ষ্যে প্রায় ১০০টি শিল্পনগরী তৈরি, মেট্রোরেল নির্মাণ, কর্ণফুলি ট্যানেল, রূপপুর আণবিক প্রকল্প, অপেক্ষাকৃত দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে বাসস্থান সুবিধা, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে দেশকে স্বনির্ভর করা, ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ ইত্যাদি।

বিশ্ব পরিসরে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নেতাদের একজন হিসেবে অভিহিত ও প্রায় ৪০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত জননেত্রী সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দক্ষ ও বিচক্ষণ রাষ্ট্র পরিচালনা সাফল্যের স্বীকৃতি এ কথা সর্বজন স্বীকৃত। শেখ হাসিনা মানে উন্নয়ন, শেখ হাসিনা মানেই উৎপাদন ও অগ্রগতি। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশের উত্তরণ। বাংলাদেশের মহাক্রান্তিলগ্নে এমন একজন দক্ষ, সৎ, সাহসী, পরিশ্রমী, জনগণের প্রতি একান্তভাবে নিবেদিত দরদি ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক পেয়ে সত্য সত্যই জাতি ধন্য।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।