প্রচ্ছদ এক্সক্লুসিভ এই দেশে আমরা আর কতদিন এভাবে দানবের জন্ম দিতে থাকব?

এই দেশে আমরা আর কতদিন এভাবে দানবের জন্ম দিতে থাকব?

46
পড়া যাবে: 6 মিনিটে
advertisement

ছাত্রলীগের ছেলেরা আবরার ফাহাদকে মে’রে ফেলেছে। (তাকে কীভাবে মে’রেছে প্রথমে আমি সেটাও লিখেছিলাম; কিন্তু মৃ’ত্যুর এই প্রক্রিয়াটি এত ভ’য়ঙ্কর এবং এত অ’বমাননাকর যে বাক্যটির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো আবরারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমি প্রক্রিয়াটি না লিখি। দেশ-বিদেশের সবাই এটা জেনে গিয়েছে আমার নতুন করে জানানোর কিছু নেই।)

advertisement

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমাকে আমার অনেক ছাত্রছাত্রীর মৃ’ত্যু দেখতে হয়েছে। তরুণ ছাত্রছাত্রীর মৃ’ত্যু বেশিরভাগ সময়েই অস্বাভাবিক মৃত্যু দু’র্ঘটনায়, পানিতে ডু’বে কিংবা আ’ত্মহ’ত্যা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের একজনকে প্রকাশ্যে পি’টিয়ে মে’রে ফেলার একটি ঘটনা ছিল; কিন্তু আমার মনে হয় আবরারের হ’ত্যাকা-টি তার থেকেও ভ’য়ানক।

তার কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই হ’ত্যাকা’-ের পর হ’ত্যাকা’রীরা পা’লিয়ে গিয়েছিল, সম্ভবত এখনো পালিয়েই আছে। কিন্তু আবরারের হ’ত্যাকারী ছাত্রলীগের ছেলেরা পা’লিয়ে যায়নি। হ’ত্যাকা- শেষ করে তারা খেতে গিয়েছে, খেলা দেখেছে, মৃ’তদে’হটি প্রকাশ্যে ফেলে রেখেছে। অ’পরাধীরা শা’স্তির ভ’য়ে পালিয়ে যায়, আবরারের হ’ত্যাকা’রীরা নিজেদের অ’পরাধী মনে করে না। সরকারের সমালোচনা করার জন্য তারা  একজন ছাত্রকে ‘শিবির সমর্থক’ হিসেবে ‘যথোপযুক্ত’ শাস্তি দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলটি তাদের জন্য অনেক নিরাপদ জায়গা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন তাদের দেখেশুনে রাখে, তাদের নিরাপত্তা দেয়। কেউ যেন মনে না করে এটি শুধু বুয়েটের চিত্র, এটি আসলে সারা বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র, কোথাও বেশি কোথাও কম।

হ’ত্যাকা-ে’র পর আমরা আরও একটি নাটক দেখেছি, সেটি হচ্ছে ছাত্রলীগের নিজেদের একটি তদন্ত। একটি হ’ত্যাকা- রাষ্ট্রীয় অ’পরাধ, সরকার তার ত’দন্ত করে বিচার করবে, শা’স্তি দেবে। সেখানে অন্যরা কেন নাক গলাবে? আত্মবিশ্লেষণ করতে চায় করুক; কিন্তু সেটি কেন গণমাধ্যমের মাঝে আমাদের জানতে হবে? শুধু তাই নয়, আমরা সবাই বুঝতে পারি একজন সন্তানের হ’ত্যাকা’-ের পর তার বাবা-মায়ের মনের অবস্থা কী থাকে।

আরও পড়ুন:  তোপের মুখে স্থান ত্যাগ ভিসির,'ভুয়া ভুয়া' বলে স্লোগান,বিক্ষোভ চলছে

সেই সময় খুঁজে খুঁজে অ’পরাধীদের বের করে তাদের বিরুদ্ধে মা’মলা করার মতো মনের অবস্থা থাকে না। আবরারের বাবা-মা তো তার সন্তানকে বুয়েটের শিক্ষকদের হাতে, প্রশাসনের হাতে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার জন্য তুলে দিয়ে এসেছিলেন। লা’শ হয়ে যাওয়ার জন্য দিয়ে আসেননি। এ রকম একটি ঘটনার পর কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের ব্যর্থতার দায়টুকু নিয়ে নিজেরা মা’মলা করার দা’য়িত্বটুকু নেয় না? বাবা-মা আপনজনকে এই অর্থহীন নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্তি দেয় না?

আমি ঠিক জানি না আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা জানেন কিনা এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ছাত্রলীগের ওপর কতটুকু ক্ষুব্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মতো আমার কোনো রকম হেনস্থা স’হ্য করতে হয় না; কিন্তু তার পরও আমি যে কোনো সময়ে চোখ বন্ধ করে তাদের বিশাল অ’পকর্মের লিস্ট তুলে ধরতে পারব। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে এ ক্ষোভ ঘৃণার পর্যায়ে চলে গেছে এবং দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের যে কয়টি আন্দোলন হয়েছে তার সবই আসলে ছাত্রলীগের প্রতি ভ’য়ঙ্কর ক্ষোভের এক ধরনের প্রতিক্রিয়া।

কিছু দিন আগে ছাত্রলীগের সভাপতি সিলেটে এসেছিল, ঘটনাক্রমে আমিও সেদিন রাস্তায় এবং তখন এক সঙ্গে আমি যত মোটরসাইকেল দেখেছি জীবনে আর কখনো এক সঙ্গে এত মোটরসাইকেল দেখিনি। এরা সবাই ছিল ছাত্রলীগের কর্মী আমার প্রশ্নটি ছিল খুবই সহজ। একজন ছাত্র এখনো লেখাপড়া শেষ করেনি তাদের আয়-উপার্জন থাকার কথা না। তা হলে তারা কেমন করে এত মোটরসাইকেল কিনতে পারে?

আরও পড়ুন:  আবরার হ*ত্যার প্রতিবাদে উত্তপ্ত রংপুর

ছাত্রলীগের কর্মকা- যদি শুধু মোটরসাইকেল কেনার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকত আমরা হয়তো সহ্য করতে পারতাম; কিন্তু যখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররা অবলীলায় তাদের একজন সহপাঠীকে নি’র্মম অ’ত্যাচার করে মে’রে ফেলে কারণ তাদের বুকের ভেতরে আত্মবিশ্বাস আছে তাদের কিছু হবে না সেটা কারো পক্ষে সহ্য করা সম্ভব না। খুবই স্বাভাবিকভাবে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রী বি’ক্ষোভে ফে’টে পড়েছে, এর আগে প্রত্যেকবার যখন এ রকম হয়েছে একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর ঝাঁ’পিয়ে পড়েছে। এবারেও কি সেটা করার চেষ্টা করবে? তাদের এখনো কি সেই মনের জোর আছে?

খবরের কাগজে দেখলাম বুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয় কুষ্টিয়ায় আবরারের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন। তার অনেক সাহস, আমাদের এত সাহস নেই। আবরারের বাবা-মায়ের চোখের দিকে আমরা তাকাতে পারব না।

কেমন করে পারব? যে দেশে একজন ছাত্র নিজ দেশকে ভালোবেসে নিজের মনের কথাটি প্রকাশ করার জন্য সহপাঠীদের হাতে নি’র্যাতিত হয়ে মা’রা যায়, কেউ তাকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসে না, সে দেশের একজন মানুষ হয়ে আমরা কেমন করে মুখ দেখব? এই দেশে আমরা আর কতদিন এভাবে দা’নবের জন্ম দিতে থাকব?

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

  • 17
    Shares
advertisement