কালীগঞ্জের ৩ পুরুষের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি যাচ্ছে কয়েকটি জেলায়

18
কালীগঞ্জের ৩ পুরুষের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি যাচ্ছে কয়েকটি জেলায়
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

সাবজাল হোসেন ॥

সুবল,মনোরঞ্জন,রতন বিশ্বাস তিন ভাই। ছোটবেলায় তাদের বাবা মা দ’ুজনেই মারা যান। ফলে অভাবের সংসারে লেখাপড়া করতে পারেননি। অল্প বয়সে সংসারের হাল ধরতে কিশোর সুবল বিশ্বাস কাজ নেন তখনকার দিনের শহরের নামকরা ননী গোপাল কুরীর মিষ্টির দোকানে। সেখান থেকে একদিকে পয়সা রোজগার করে সংসার চালাতেন। অন্যদিকে তার ওস্তাদ ননী গোপালের নিকট থেকে মিষ্টি তৈরীর কৌশল আয়ত্ব করেন। কিছুদিনের মধ্যে ৩ ভাই মিলে কালীগঞ্জের হাটচাঁদনীর মধ্যে নিজেদের তৈরী করা মিষ্টির দোকান দেন। এখান থেকে শুরু। এভাবে চলেছে প্রায় ২০ বছর। পরে ভাইয়েরা পৃথক হয়ে যাওয়ায় এবার শহরের কোলাষ্ট্যান্ডে দোকান দেন সুবল বিশ্বাস। নাম দেন সুবল মিষ্টান্নভান্ডার। এখানে অত্যন্ত দক্ষতা আর আন্তরিকতার মধ্যদিয়ে ব্যবসা চালানোর কারনে অল্প দিনের মধ্যেই তার রসগোল্লার সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সুবল বিশ্বাসের ৯ ছেলে। তাদের মধ্যে বড় ৫ ছেলেকে তিনি নিজে মিষ্টি তৈরীর কলা কৌশল শিখিয়ে দিয়ে ব্যবসা আরও সম্প্রসারন করেন। পাশেই দেন মেজো ছেলের তত্ত্বাবধানে মেজদার জলযোগ নামের আরেকটি মিষ্টির দোকান। যেখান থেকে আশপাশের জেলাতেও এখন রসগোল্লা ও ল্যাংচা যাচ্ছে। সুবল বিশ্বাস বয়োবৃদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার পর ব্যবসার হাল ধরেন অন্য ৫ ছেলে। দোকান আর বাসা কাছাকাছি হওয়ায় তারা একদিকে মিষ্টি তৈরীর কারিগর হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। অন্যদিকে দোকানেও বসেন। এখন ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়েছেন সুবল বিশ্বাসের নাতীরাও। ফলে তাদের এ ব্যবসার সময়কাল এখন ৩ পুরুষে দাঁড়িয়েছে। কথাগুলো বললেন ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের সুনামধন্য মিষ্টির কারিগর মৃত সুবল বিশ্বাসের ছেলে শ্যামল বিশ্বাসের।

সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, শহরের ফয়লা হাসপাতাল সড়কের কোলাস্ট্যান্ডে রয়েছে সুবল মিষ্টান্ন ভান্ডার ও মেজদার জলযোগ নামের দুটি মিষ্টান্নের দোকান। টেবিলের ওপর কাাঁচ দিয়ে ঘেরা তাকের মধ্যে বড় বড় পাত্রে সাজানো রয়েছে রসগোল্লা,ল্যাংচাসহ সব ধরনের মিষ্টান্ন। স্থানীয়রা ছাড়াও বাইরের মানুষ ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছেন মিষ্টি নেওয়ার জন্য। অন্য মিষ্টি বিক্রি কম হলেও তাদের তৈরীকৃত রসগোল্লা আর ল্যাংচা বিক্রি হচ্ছে হরদম।

আরও পড়ুন:  খুলনায় পুলিশের অভিযানে মাদকসহ গ্রেফতার ৪

সুবল বিশ্বাসের নাতী অমিত বিশ্বাস মিঠুন জানান, দুই দোকান মিলে প্রতিদিন তাদের সাড়ে ৪’শ থেকে ৫’শ কেজি রসগোল্লা ও ল্যাংচা খুচরা বিক্রি হয়ে থাকে। আর পাইকারী অর্ডারী মাল সাপ্লাই দেন রাতে। এছাড়াও বিশেষ ব্যবস্থায় ফরিদপুর, মাগুরা, রাজবাড়ী, যশোরসহ বিভিন্ন শহরে মিষ্টান্ন পাঠিয়ে দেন অর্ডার অনুযায়ী। মিঠুন জানান, এখন শহরের সব প্রান্তে ফাষ্টফুডের দোকান রয়েছে । যেখানে তাদের রসগোল্লা ও ল্যাংচা মিষ্টি কিনে নিয়ে গিয়ে ফ্রিজে রেখে বিক্রি করছেন।

কথা হয় মেজদার জলযোগের মালিক অশোক বিশ্বাসের সাথে। তিনি জানান,তার দোকানের সাদা রসগোল্লা আর বিশেষ ভাবে তৈরি ল্যাংচা মিষ্টির ব্যাপক চাহিদা। সাদা রসগোল্লা দেখতে সাদা এবং নরম, আর বিশেষ ভাবে তৈরি ল্যাংচা দেখতে পানতোয়ার মতো তবে লম্বা। এগুলো খেতে খুব সুস্বাদু। দেশের বিভিন্ন স্থানে এখানকার রসগোল্লা আর ল্যাংচা মিষ্টি পাঠানো হয়। প্রতিদিন বিকাল থেকে এই মিষ্টি তৈরী শুরু হয়। দোকান ও কারখানা মিলে মোট ১৫ জন কর্মচারী রয়েছে। এখান থেকে তাদেরও সংসার চলছে।

তিনি জানান, তার বাবা সুবোল বিশ্বাস প্রায় ৬৮ বছর মিষ্টি তৈরীর সাথে জড়িত ছিলেন । বাবার মৃত্যুর পর ছেলেরা ব্যবসার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। এখন তাদের ছেলেরাও জড়িয়ে আছেন তাদের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়। অশোক জানান, বাবার কাছ থেকে শেখা বিশেষ পদ্ধতিতে গরুর খাঁটি দুধ থেকে পাওয়া ছানা দিয়ে রসগোল্লা ও ল্যাংচা তৈরি করেন। এলাচ,বেকিং পাউডার ব্যবহার করে বিশেষ পদ্ধতিতে এগুলো তৈরী করা হয়। তাদের তৈরীকৃত রসগোল্লা একেবারেই নরম। মুখের মধ্যে দিলেই গলে যাবে সহজে। একবার কেউ তার বানানো রসগোল্লা আর ল্যাংচা খেলে আরেকবার খেতে মন চায়।

অশোক বিশ্বাস আরো জানান, প্রতিদিন গ্রাম থেকে আসা দুধ ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে গরুর দুধ সংগ্রহ করে সেখান থেকে ছানা তৈরি করা হয়। প্রতিদিন সাড়ে ৪ থেকে ৫’শ কেজি রসগোল্লা আর ল্যাংচা তৈরি করতে ৭০ থেকে ৮০ কেজি গরুর দুধের খাঁটি ছানা ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন, মাত্র ১১০ টাকা কেজি দরে মিষ্টি বিক্রি করেন। এক কেজিতে বড় সাইজের মিষ্টি ১১ পিচ এবং ছোট সাইজের ২২ পিস দেওয়া হয়। খুচরা বড় সাইজের একপিচ রসগোল্লা ১০ টাকা আর ছোট সাইজের ৫ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। মিষ্টি বানানো আমাদের পূর্ব পুরুষের ব্যবসা। আমরা বেশি লাভে বিশ্বাসী না। অল্প লাভে বেশি পরিমানে বিক্রি করাই আমাদের উদ্দেশ্য। স্থানীয়সহ দুরদুরান্তের মানুষ আমাদের মিষ্টির সুনাম করে এটাই আমাদের বড় সম্পদ। দেশের করনা পরিস্থিতির জন্য কিছুদিন ব্যবসাটা বেশ মন্দা গেছে। কিন্ত ধীরে ধীরে আবার পূর্বের অবস্থায় যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন:  পাইকগাছায় দুই কিঃমিঃ রাস্তা স্বেচ্ছাশ্রমে সংস্কার হচ্ছে

যশোর থেকে মিষ্টি কিনতে আসা ক্রেতা সেনাবাহিনীর সদস্য আলিনুর রহমান জানান,তিনি ঝিনাইদহে আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে এসেছেন। আগেই শুনেছেন মেজদার জলযোগের রসগোল্লা অনেক জনপ্রিয় ও ভাল। তাই তিনি যশোর থেকে এসেছেন মিষ্টি কিনতে।

স্থানীয় ফয়লা গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম জানান, মেজদার জলযোগের মিষ্টির ব্যাপক চাহিদা ও জনপ্রিয়তা রযেছে। প্রতিদিন দুর দুরান্ত থেকে মিষ্টি নিতে আসেন লোকজন। অনেক সময় দেখা যায় জলযোগের রসগোল্লা কিংবা ল্যাংচা নিতে মানুষের বড় ধরনের ভীড় পড়ে যায়। আর ঈদ পূজাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এলাকার এ ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি মানুষের হাতে তুলে দিতে ব্যাপক প্রস্ততি থাকে।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 5
    Shares