প্রচ্ছদ এডিটরস পিক

ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন ও পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি

13
ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন ও পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

সালাম সালেহ উদদীন

সারা দেশে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, হত্যা ও শারীরিক নির্যাতনের যেন জোয়ার বইছে। কিছুতেই এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনও তেমন ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারছে না। একটা সময় বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের প্রকোপ ছিল খুব, সন্ত্রাসবাদ হয়ে উঠেছিল শঙ্কিত জীবনের আরেক নাম। এখন সে জায়গাটি দখল করে নিয়েছে ধর্ষণ, যৌন সন্ত্রাস ও নারীর প্রতি অবমাননা। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ জন নারী কিংবা কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে এ দেশে। যা খুবই উদ্বেজনক।

সরকারি এক হিসাবে বলা হয়েছে গত ১৬ বছরে ধর্ষণের ঘটনায় ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার থেকে মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৫৪১টি। এর মধ্যে আসামির শাস্তি হয়েছে মাত্র ৬০টি ঘটনায়। এসব কারণে ধর্ষণের অপরাধে শাস্তির মাত্রা বাড়ানোর দাবি জোরালো হতে থাকে দেশের সব মহল থেকে। এ ছাড়াও অনলাইনে ৭০ শতাংশের বেশি নারী হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন। এমনকি নারীরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে তাদের মত প্রকাশ করতেও পারেন না। কোনো দল বা সংগঠন বা ব্যক্তির মতের বিরুদ্ধে গেলেই যৌন হয়রানিমূলক বাক্য বা শব্দ তেড়ে আসে। এ ছাড়া ধর্ষণের মাধ্যমে জীবননাশের হুমকিও চলে আসে কখনো কখনো। যৌন হয়রানির শিকার নারীর অবস্থা কতটা ভয়ানক, শোচনীয় এবং প্রকট তা চারদিকে চোখ রাখলেই বোঝা যায়।

আইনের ফাঁকফোকর আর দীর্ঘসূত্রতার কারণে এসব অপরাধের বিচার হয় না অথবা অনেক সময় অপরাধী আইনের ফাঁকফোকর গলে বের হয়ে আবারও একই রকমের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। আন্দোলনকারীরা ধর্ষণকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃতু্যদন্ড করার দাবি জানিয়েছে। দেশের সচেতন মানুষের প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মুখে ধর্ষণের শাস্তি মৃতু্যদন্ডের বিধান রেখে সংশোধিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’-এর খসড়া মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশও জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে এটি আইনে পরিণত হয়েছে। এই মুহূর্তে জাতীয় সংসদের অধিবেশন না থাকায় রাষ্ট্রপতি এটিকে অধ্যাদেশ আকারে জারি করেছেন। এর ফলে অপরাধের মাত্রা কমে আসবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ এর ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন।’ দেশজুড়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বিরোধী আন্দোলন এবং ধর্ষণকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃতু্যদন্ড করার দাবির মধ্যে সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে।

আরও পড়ুন:  মহাসংকটে পৃথিবী হে মানুষ, ফিরে এসো

শুধু আইন কঠোর করে বা আইনের কঠোর প্রয়োগ করে ধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। ধর্ষণের মতো অপরাধ প্রতিরোধে বর্তমান প্রজন্মের মনন ও মনোজগৎ পরিবর্তন করতে হবে বলে জানান তিনি। ইন্টারনেটের বিভিন্ন কন্টেন্ট দেখে অপরাধীরা ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধে উদ্বুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি অপরাধের কৌশল শেখে বলেও মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী। তার সঙ্গে সহমত পোষণ করছি। দেশব্যাপী বেকারত্ব নৈতিক অবক্ষয় ও মাদকাসক্তি এর অন্যতম কারণ। সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে নারীকে মানুষ না ভেবে ভোগ্যপণ্য হিসেবে ভাবা। সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা পুরুষের কাছে রাখা। বিয়ের পর স্বামীও তাই ভাবে। বিয়ের কাবিন হচ্ছে সম্ভোগের দাসস্বরূপ আর্থিক মূল্যের দলিল। দেনমোহরের পুরো টাকা বা অর্ধেক শোধ করার পরই স্ত্রী বা নারীর প্রতি বৈধ ভোগ-দখল প্রতিষ্ঠিত হয়। কেবল তাই নয়- যে পুরুষ তাকে বিয়ে করে, সে তাকে খাওয়া-পরা, পোশাক-আশাক ও দামি অলঙ্কারে আবৃত করার ফলে তার মধ্যে এ মানসিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় যে তোমাকে আমি সব দিয়েছি, তুমি আমার কথার বাইরে চলতে পারবে না। যে পরিবারে বা সমাজে এর ব্যত্যয় ঘটেছে, সেখানেই নেমে এসেছে অবমাননা-নির্যাতন। আজও যে নারী নির্যাতনকেন্দ্রিক ভয়াবহতা আমরা পরিবার ও সমাজে প্রত্যক্ষ করি, এটা ওই মানসিকতারই ফল। বিয়ে করে একজন নারীকে ঘরে আনলেই, খাওয়ালে-পরালেই কেবল তাকে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করার অধিকার জন্মাবে এ মানসিকতা সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি, অর্থবিত্তের দাপটের কারণেই বেশির ভাগ সময় নারী নির্যাতিত হচ্ছে।

যে কোনো নারীকেই তার পারিবারিক ও সামাজিক গন্ডি এঁকে দেয় পুরুষ। পুরুষের স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটলে নারীকে বিপথগামী, কূলটা বলে আখ্যা দেওয়া হয়। যে কোনো মুহূর্তে তার ওপর নেমে আসে অত্যাচার-নির্যাতনের খড়গ। পুরুষ বরাবরই নারীকে ভোগ্যবস্তু ও সেবাদাসী হিসেবে দেখে আসছে। যে সমাজে আইনের শাসন নেই- সেখানে নারী নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে- এটাই স্বাভাবিক। আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং তার মাধ্যমে সঠিক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা গেলে সমাজ থেকে নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা কমে আসবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত রয়েছে সেখানে নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা একেবারেই কম।

আরও পড়ুন:  বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা : বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার স্মৃতি

আরও একটি সমস্যা হচ্ছে আমাদের সমাজ ধর্ষিতাকে নিয়ে তামাশা করে, বিচার চাইতে গেলে ওই মেয়েকেই প্রমাণ করতে হবে সে ধর্ষিতা। এতে নারীর মানসিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়। এ ছাড়াও সমাজের প্রভাবশালীদের প্রশ্রয়ের কারণে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই ধরনের ঘটনা নারীর নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নারী উন্নয়ন নীতি এবং তা বাস্তবায়নে নানা পদক্ষেপ গৃহীত হলেও সামাজিকভাবে নারী নিষ্পেষিত। অর্থনৈতিকভাবে নারীর উন্নয়ন সাধিত হলেও আজ নারীরা দাঁড়িয়ে আছে অপমান, অসম্মানের পিলারে ঠেস দিয়ে। নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াস মানবসমাজের মূল কাঠামো গঠনের ভিত্তি। কিন্তু সমাজ ও সভ্যতার অপরিহার্য এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েও নারীরা আজ অবহেলিত এবং সব ধরনের নির্যাতন অবমাননা বৈষম্যের শিকার।

মনে রাখতে হবে দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই নারী। এ নারী ঘর সামলায়, সন্তানের জন্ম দেয় এবং তাদের লালন-পালন করে, বাইরে কাজ করে পুরুষের পাশাপাশি। গ্রামীণ নারীর শ্রমঘণ্টা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি। ঘরের রান্নাও তো শ্রমের কাজ। তাদের যদি জীবনঘনিষ্ঠ কিছু শিক্ষাসহ তাদের নিরাপত্তার আশ্বাস না দেওয়া যায়, তাহলে তাদের জীবন নানাভাবে বিপন্ন হবে। নারী হলো প্রকৃতির অংশ। নারী জননী-জায়া-ভগিনী। তাদের অন্যায় নির্যাতন করে কেউ যেন কোনোমতে ছাড় না পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকেই।

সত্য ও ন্যায়ের পথই অগ্রগতি ও কল্যাণের পথ, প্রকৃত পথ। অপরাধীর প্রতি আপসমূলক আচরণ হলো অকল্যাণকর বিপজ্জনক। সমাজে নারীকে রক্ষা করতে হলে শুধু আইন দিয়েই হবে না, শোষক-নির্যাতক-ধর্ষক ও নারীকেন্দ্রিক ভোগবাদী পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন করতে হবে, নারীকে মানুষ হিসেবে দিতে হবে সম্মান। ধীরে ধীরে যদি সমাজে এই ইতিবাচক ও শুভ পরিবর্তন সূচিত হয় তাহলেই নারীরা রক্ষা পাবে।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 5
    Shares